সুস্মিতা সরকার মৈত্র

“রানাঘাটের মেয়ে। গল্প পড়তে ভালোবাসলেও গল্প লেখাটা যে বেশ চাপের কাজ সেটা লিখতে শুরু না করলে কোনোদিন বুঝতেই পারতাম না। তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্রী হওয়ার সুবাদে অনেকরকম গল্প টল্প তো পড়লাম, কিন্তু লেখা শুরু এক বন্ধুর গুঁতোয়। আসলেই এক ল্যাদ পাবলিক আমি। লিখতে সময় লাগে, সেটাকে ঘষামাজা করতে আরও। এর সঙ্গে আছে আমার প্রায় তিনবছরের কন্যা রত্নের নানান দাবিদাওয়া। আপাতত তার ‘কি’ সিরিজের পর ‘কেন’ সিরিজের জবাব দিতে দিতে পাগল পাগল দশা। তাই লেখালেখি বেশ অনিয়মিত।
গল্প লিখতে ভালোবাসি, পড়তে আরও বেশি। এছাড়াও ভালো লাগে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে, ছবি তুলতে, রান্না করতে (রোজকার নয় যদিও!)।
আমার এই লেখা কারোর ভালো লাগলে ভালো লাগবে। আর ভালো না লাগলে কেন ভালো লাগল না সেটা জানতে পারলেও খুব ভালো লাগবে।” – সুস্মিতা

‘তোমাদের জয়াদিকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না।’ ফোনটা ধরতেই ঝাঁ ঝাঁ করে বলে উঠল রাহুল।
‘কেন তোর মা কি করল আবার?’ আমার গলায় কৌতুক। রাহুলের রাগের কারণ আমি আন্দাজ করছি।
‘না, তেমন নতুন কিছু না। তবে নতুন রেজাল্ট। এবার ওনাকে হসপিটালে নিতে হয়েছে।’
‘সে কি রে! কি বলছিস তুই?’ কৌতুকের সুর নিমেষে উধাও আমার গলা থেকে। ‘কি খেয়েছে এবার? কি হয়েছে? কোন হসপিটালে?’ হুড়মুড় করে এক নিঃশ্বাসে প্রশ্নগুলো করে ফেল্লাম।
‘দাঁড়াও দাঁড়াও। এত প্রশ্ন একসঙ্গে কর না তো! তোমরা ভাইবোনগুলো না সত্যি। সব একেক রত্ন।’ রাহুলের গলায় রাগ আর ভালবাসা দুটোই ঝরে পরে।
‘পুরো ঘটনাটা খুলে বলবি তো!’
‘কাল মা বেরিয়েছিল কিছু কেনাকাটি করতে। ফেরার সময় ভাবছে চটপটা খাবারের এমন সুগন্ধ কোথা থেকে এলো? রাস্তার ধারে গাড়ি থামিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে একটা ছোট দোকানে বেসনের পকোড়া ভাজা হচ্ছে। সোনালি রঙের পকোড়া আর তার সঙ্গে লেবুর রস দিয়ে মাখা কাঁচা পেঁয়াজের সালাড আর পুদিনার চাটনি। দেখেই নাকি জিভে জল এসে গিয়েছিল মা’র। আর দেরি না করে কুড়ি টাকার বেসনের পকোড়া কিনে খেতে খেতে বাড়ি ফিরেছে। বাড়ি এসে আমাকে শেষটা সেধেছিল। আমি খাই নি বলে একটা বিশাল হাসি উপহার দিয়ে নিজেই মেরে দিল বাকিটা। আর তারপর শেষ রাত থেকে শুরু হল বমি। আজ সকালে সান্যাল ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। এখন বাড়ি ফিরে শুধু জল মুড়ির উপর আছে।’
‘তবে এই যে বললি হসপিটালে আছে?’
‘আরে, ডাক্তারখানা বলতে গিয়ে ভুল করে হসপিটাল বলে ফেলেছি। আর আমি তো বললাম নিতে হয়েছে, ভর্তি‌ হয়েছে কখন বললাম?’ আবার ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে রাহুল।
‘আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখন কেমন আছে জয়াদি?’
‘ঐ যে বললাম এখন শুধু জল মুড়ি খেয়ে আছে। ওষুধ পরেছে, তাই অবস্থা এখন একটু ভালো। ওষুধ খাওয়ার পর থেকে আর বমি হয় নি।’
‘আচ্ছা। জয়াদিকে বলিস বিকেলে সময় পেলে একবার যাব।’
‘ঠিক আছে, বলে দেব।’ ফোন রেখে দিল রাহুল।
জয়াদি আমার দিদি। নিজের না। জেঠতুতো। আমার নিজের দিদি নেই। তবে মনে হয় আমার নিজের দিদি থাকলেও এর থেকে বেশি নিজের হতে পারত না। আমাদের তুতো ভাইবোনরা সবাই যেন নিজের ভাই বোন এমন ভাবেই বড় হয়েছি। জয়াদি, আমি রিন্টু, অপু, সন্তু, ঘনা, নিনা।

না, যৌথ পরিবার ছিল না আমাদের। কিন্তু কি করে যেন ওরা সবাই একে অপরের কাছের মানুষ হয়ে বড় হয়েছি। আমাদের কাকা জেঠাদের বাড়িগুলো সব কাছাকাছি ছিল। দক্ষিণ কলকাতা তখন তেমন কুলীন ছিল না। তাই বোধহয় দাদুর অনেকগুলো বাড়ি ছিল। বাবা, জেঠা, কাকাদের সবার জন্য একটা করে বাড়ি। আর সব বাড়িই কাছাকাছি। পিসিদের বিয়েও হয়েছিল আশেপাশেই। সারা বছরই নানান কারনে সবাই একে অপরের বাড়িতে গিয়েছি। কারণ ছাড়াও গিয়েছি অবশ্য। তাই আমাদের ছোটবেলাটা এক অদ্ভুত নৈকট্যে কেটেছে। বড় হয়ে দেশে বিদেশে নানান জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলাম আমার সবাই। কিন্তু আজ এই বুড়ো বয়সেও আমাদের ভাইবোনেদের পরস্পরের প্রতি টান বা ভালবাসার কোনও ঘাটতি নেই। তখন যেমন জেঠা, জেঠিমা, কাকা, কাকিমা, পিসি, পিসেমসাইদের নিজের বাবা মায়ের মত মান্য করতাম, এখন তেমনই ভাইবোনদের ছেলে, মেয়ে, নাতি, নাতনিদেরও নিজের বলেই মনে করি।
আমাদের ভাইবোনেদের গল্প শুরু করলে মহাভারত হয়ে যাবে। সবাই ছিলাম মহা দুষ্টু। আর সবকটাই ছিলাম চূড়ান্ত আড্ডাবাজ। আর আমাদের পেটুক স্বভাবের কথা নাহয় নাই বললাম। আমাদের উৎপাতে রান্নাঘরে তালা দিয়ে রাখতে হত যদি কোনও বাড়িতে আরও লোক আসার কথা থাকতো আর আমরা সব ভাইবোনরা উপস্থিত থাকতাম। তবে জয়াদির একটা ব্যতিক্রমী গুণ ছিল। খাবারের ব্যাপারে ছোট থেকেই ওর নাক ছিল অসম্ভব তীক্ষ্ণ।
এখনও মনে পড়লে হাসি পায়। আমারা সবাই তখন বেশ ছোট। তিন্নি পিসির বাড়ি গিয়েছি। ঘনার জন্মদিন। ছোটদের জন্য মাংসের ঘুঘনি, লুচি, পায়েস আর মিষ্টি। মুখে দেওয়ার আগেই জয়াদি নাক কুঁচকে বলে ‘গন্ধ’! অপ্রস্তুত নন্দা জেঠিমা যতই মেয়েকে চুপ করাতে চান, মেয়ে তত জোরে বলে ‘ঘুঘনিতে গন্ধ লাগছে’। সেদিন মায়ের হাতের থাপ্পড় খেয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে জয়াদি শুধু লুচি খেয়েছিল, তবু গন্ধ হয়ে গিয়েছে এমন ঘুঘনি খায় নি।
জয়াদি এমনই। ছোট থেকেই। খাবারের গন্ধ খুব সহজেই চিনতে পারত। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নিজের মনেই বলে উঠত ‘কেউ আলুর দম রান্না করছে। হিং ফোড়ন দিয়ে।’ কিম্বা, ‘আঃ, ধনেপাতা দিয়ে রুই মাছের ঝাল বানাচ্ছে কেউ।’ একটু পরে আর সবাই খেয়াল করত জয়াদি ঠিকই বলেছে। কারোর বাড়িতে জয়াদিকে খেতে ডেকে সারপ্রাইজ দেওয়ার কোনও উপায় ছিল না। ঠিক বাড়িতে ঢুকে বুঝে ফেলত কি কি রান্না হয়েছে। জয়াদিকে নিয়ে আমাদের বাকি ভাইবোনদের এটা একটা কমন খেলা ছিল। আমরা এর নাম দিয়েছিলাম মেনু কুইজ। কারোর বাড়িতে গিয়ে সবাই জয়াদিকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করতাম ‘আজ কি মেনু?’ পরে দেখা যেত মা, কাকিমা, পিসিরা সবাই হাজির এই খেলায় অংশ নিতে। এমনকি জয়াদির বিয়ের দিনও এই মেনু কুইজ খেলা হয়েছিল। নন্দা জেঠিমা আর বুড়ো জেঠু ইচ্ছে করেই বিয়ের দিনের মেনু মেয়ের কাছে গোপন রেখেছিলেন। বৌভাতের দিনও সব ভাইবোনরা এই খেলায় মেতেছিলাম।
অদ্ভুতভাবে জয়াদির ছেলে রাহুলও একই গুণ পেয়েছে। এখন যতই ফোনে রাগ দেখাক, রাহুল নিজেও মায়ের এই গন্ধবিলাসের দারুন ফ্যান। ও ও রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে যায়। কোনও খাবারের গন্ধ হয়ত পেয়েছে। সেটা ভুট্টা পোড়া হতে পারে। আলুর চপ হতে পারে। বিরিয়ানির গন্ধ হতে পারে। মসলা ধোসার তরকারির গন্ধ হতে পারে। আবার সামান্য ঘটি গরমও হতে পারে। চাকরিসূত্রে আমেরিকায় কয়েক বছর থেকে আসার পর এটা আরও বেড়েছে।
‘ঐ দেশে সবাই ঘরদোর, জানলা এমন বন্ধ করে রাখে যে খাবারের গন্ধ বাইরে আসার উপায় নেই। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এমন খাবারের সুগন্ধ ওখানে পাওয়া যায় নাকি? কলকাতায় দেখ, সব সময়ই প্রতিবেশির রান্নার গন্ধ পাওয়া যায়। প্রতিবেশির সঙ্গে তোমার হয়তো ঝগড়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে তোমার কথা নাই থাকতে পারে, কিন্তু পাশের বাড়িতে সর্ষে ফোড়ন দিয়ে শুক্তো রান্না হচ্ছে, নাকি আচ্ছা করে পেঁয়াজ রসুন কশিয়ে মুরগি রান্না হচ্ছে সবকিছু বাড়িতে বসেই টের পাওয়া যাবে। রসুন ফোড়ন দিয়ে শাকভাজা হোক বা হিং ফোড়ন দিয়ে ধোকার ডালনা সেই খাবারের সুগন্ধে বাড়িতে বসেই তোমার মন ভরে যাবে। আহা, বাড়িতে বসে বসে এই রকম গন্ধেই যদি পেট ভরে যেত!’ রাহুল বারে বারে আক্ষেপ করে। এত আক্ষেপ শুনে বাধ্য হয়েই জয়াদিকে ভালো ভালো সব খাবার রান্না করতে হয়। রোজ সকালে উঠেই আশেপাশের বাড়ির গন্ধ শুঁকে রাহুল বিভিন্ন পদের নাম করে যায়। জয়াদি চেষ্টা করে তার মধ্যে থেকেই কয়েকটা পদ ঝটপট রেঁধে ফেলতে। শনি রবিবার রাহুল নিজেও রান্নায় হাত লাগায়। মানে বলা যেতেই পারে যে রাহুল জয়াদিরই ছোটখাটো একটা সংস্করণ।
সেদিন বিকেলে একটু তাড়াতাড়িই গেলাম জয়াদির বাড়ি। সবসময়ের কাজের মেয়ে নেহা দরজা খুলে বলল মাসিমা টিভির ঘরে। ঘরে ঢুকে লক্ষ্য করলাম বেচারা জয়াদিকে একটু কাহিল দেখাচ্ছে। তবুও আমাকে দেখেই হইচই শুরু করে দিল।
‘রাহুল, রাহুল, দেখ কে এসেছে!’
‘আরে, রিন্টু মাসি যে। কেমন আছ তুমি? পপিন, পুকাই এরা সব কেমন আছে? প্রবালমেসো এল না?’ বলতে বলতে টিভির ঘরে ঢুকল রাহুল। মুখে একটা মুচকি হাসি ঝুলিয়ে।
‘কেন, তখনই তো বললাম বিকেলে আসব। তুই মা’কে বলিস নি?’ একটু ভ্যাবাচ্যাকাই খেয়ে গেলাম আমি।
‘আরে, মা’কে একটা সারপ্রাইজ দেবো বলেই তো মা’কে কিচ্ছু বলি নি।’ বলতে বলতে এগিয়ে এসে রাহুল আমাকে জড়িয়ে ধরল।
জিজ্ঞাসা করি, ‘নয়না কই? আর আমার তিতাস দাদু?’
‘ওরা মামার বাড়ি গিয়েছে, মামার বিয়ের বাজার করতে। চয়নের বিয়ের দিন তো চলেই এল।’ বলতে বলতে সোফায় নিজের পাশে ইঙ্গিত করল জয়াদি। ‘তুই বস, রিন্টু।’
‘যাহ্‌, নয়নার সঙ্গে অনেক দিন দেখা হয় নি। আর তিতাসদাদুকেও অনেক দিন দেখি নি। কিন্তু জয়াদি, তোমার বয়স তো হচ্ছে। এখনও একি কাণ্ড কর বল তো? এবার তো একটু বুঝে খেতে হবে?’ জয়াদির পাশে বসতে বসতে বললাম আমি।
‘তুই চুপ কর রিন্টু। বেশি খাই নি। এইটুকুও যদি না খেতে পারি তাহলে বেঁচে থেকে কি লাভ?’ জয়াদি এক দাবড়ানি দিল আমাকে।
‘তুমি একটু বোঝাও রিন্টুমাসি। এই রকম করলে কি মুস্কিল বল তো? আজ নাহয় শনিবার, তাই আমি বাড়ি ছিলাম। ডাক্তার দেখানো বা ওষুধ আনা এসব করলাম। অন্যদিন হলে কত অসুবিধা হত বল? সপ্তাহের পাঁচ দিন আমার অফিস, নয়নার অফিস আর তিতাসের স্কুল সামলে সময় হয়?’ রাহুল আমাকে অভিযোগ জানালো।
সেই অভিযোগের উত্তর দেওয়ার আগেই দরজায় আবার বেল। কে এল এখন আবার! নেহা দরজা খুলল, আর একটু পরেই ঘরে ঢুকল ঘনা, সাত বছরের নাতনি শ্রেয়াকে নিয়ে। রাহুল ওকেও ফোন করে জয়াদির শরীর খারাপের কথা বলে বিকেলে একটু আসতে বলেছিল।
‘রিন্টুদি, তুমিও এসেছো? প্রবালদা এসেছে নাকি? তোমার নাতিরা?’ ঘরে ঢুকে ঘনা যত না অবাক, তার থেকে বেশি খুশি।
একটু পরেই ঢুকল অপু। সঙ্গে ওর বর অরিন্দম আর নাতি লাড্ডু। সন্তু আর ওর বউ সুমিতাও এল ওদের নাতি গুড্ডুকে নিয়ে। সবাই অবাক। জয়াদিকে দেখতে এসে অন্য ভাইবোনদের সঙ্গে দেখা হওয়াটা যেন মেঘ না চাইতেই জল। পাঁচ ভাইবোন জয়াদি, আমি, অপু, সন্তু, ঘনা কতদিন পর এক জায়গায়। আর আমাদের সঙ্গে আবার তিনটে বাচ্চা। শ্রেয়া, লাড্ডু, গুড্ডু। নিমেষে ঘরে হইচই লেগে গেল। এই চাঁদের হাটে শুধু নিনাই নেই। এখন ফ্রান্সে আছে নিনা।
‘শুধু নিনাটার জন্য বড্ড মন খারাপ করছে রে।’ আক্ষেপ ঝরে পরল অপুর গলা থেকে।
‘চিন্তা কর না অপাই। একটু পরে আমরা নাহয় নিনাইকে ফোন করে সবাই মিলে কথা বলব। কি, ভালো হবে না?’ রাহুল ছোট্ট থেকেই অপু, নিনাকে মাসি না বলে অপাই আর নিনাই বলে ডাকে। সেই সূত্রে আমাদের আর ছেলেমেয়েগুলোও সব অপাই আর নিনাই বলেই ডাকে।
আমরা সবাই জমিয়ে বসলাম ঘর জুড়ে। কেউ মাটিতে, কেউ সোফায় আবার কেউ বা সোফার হাতলে। সবাই কথা শুরু করলো জয়াদির শরীর খারাপ নিয়ে। একটু আগে আমাকে দাবড়ানি দিলেও এখন সবার কথা শুনে পঁয়ষট্টি বছরের জয়াদি কেমন শিশুর মতন দুঃখী দুঃখী মুখ করে চুপ করে রইল। তবে এই পরিবেশ বদলাতে বেশি সময় লাগল না। অল্পক্ষণের মধ্যেই জয়াদির শরীর খারাপ, খেতে ভালবাসা, বমি করা সব কিছু ভুলে আড্ডা জমে উঠলো দ্রুত। আমরা সবাই মিলে এমন হইচই শুরু করলাম যেন আবার সেই ছোটবেলার দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছি।
‘নাও, আড্ডার সঙ্গে সঙ্গে হাত চালাও।’ বলতে বলতে নেহা এসে চা, রকমারি বিস্কুট, নিমকি, কাজুবরফি, আর চানাচুর নামিয়ে দিল। অনেক দিন থেকে এই বাড়িতে আছে নেহা। ও জানে আমরা ভাইবোনরা সবাই কত খাদ্যরসিক। আর জানে একসঙ্গে হলে আমরা সবাই কি হুল্লোড় করি।
‘ভাগ্যিস জয়াদির শরীরটা খারাপ হয়েছিল, তাই অনেকদিন পর আমরা সবাই এরকম আনন্দ করছি।’ এহেন কথায় চটাচট কয়েকটা চাঁটি পড়ল অপুর মাথায় আর পিঠে। ‘বারে, নাহলে সংসার সামলে আর সময় হয় আমাদের সবার আড্ডা দেওয়ার?’ মাথা আর পিঠ আড়াল করতে করতে অপু যুক্তি সাজাল।
‘অপাই, তাই বলে মা’কে আর নাচিও না। আমরা সবাই মিলে পিকনিক করবো বরং। এমনিতেই আজকের আড্ডা থেকে বাদ পড়ার জন্য নয়না আমায় একহাত নেবে।’ রাহুল অপাইয়ের দুর্দশা দেখে ফিকফিক করে হাসতে হাসতে প্রস্তাব দিল।
‘বাঃ বাঃ, এটা খুব ভালো আইডিয়া। আমাদের বাড়ির ছাদে সবাই মিলে পিকনিক করবো। খুব মজা হবে। বেশ সবাই মিলে রান্না করা হবে। বাচ্চাগুলোও হইচই করতে পারবে।’ সুমিতার চোখ চকচক করে উঠলো।
নিমেষে আড্ডার গতিমুখ ঘুরে গেল। জয়াদির শরীর খারাপের কথা বেমালুম ভুলে আমরা সবাই মিলে পিকনিকের দিন আর মেনু ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
‘নারকোল কোরা দিয়ে মুগের ডালের সঙ্গে বেগুনি তো করতেই হবে।’ আমি বললাম। বলেই খেয়াল হল যে আমি নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মেরেছি।
‘তা করতে হবে না?’ অপুর এই কথায় সবাই হো হো করে হাসতে শুরু করলো।
আসলে আমার বেগুনি প্রীতির একটা গল্প আছে। একবার, তখন আমি অনেক ছোট। মানে আমরা সবাই ছোট। নিনার জন্মদিনে আমরা পিসির বাড়িতে গিয়েছি। সকাল থেকেই আমরা সবাই খুব হুটোপুটি করে সারা বাড়ি মাতিয়ে খেলছি। খেলার সঙ্গে সঙ্গে চলছে সমানে মুখ চালানো। কখনও রসগোল্লা, কখনও মিষ্টি পান, কখনও দুপুরের মেনু থেকে আলুভাজা। দুপুরের খাওয়ার পরেও নেই কোনও বিশ্রাম।
সন্ধ্যে হল। সারাদিন হুটোপুটি করে আমার শরীরটা ভালো লাগছিল না। শরীরের আর কি দোষ। হাবিজাবি খাওয়া তো কম হয় নি। বিনুদিদি বেগুনি ভাজছিল। সন্ধ্যের অতিথিদের জন্য। আমরা ছোটরা আশেপাশেই ঘুরঘুর করছিলাম। যদি একটা বেগুনি জোটে কপালে। প্রথম ব্যাচ বেগুনি কড়াইতে ছেড়েছে বিনুদিদি। আর ঠিক তখনই আমার মনে হল আমার দুনিয়াটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম এইবার আমার বমি হবে।
‘বিনুদিদি, শিগগির শিগগির একটা বেগুনি দাও।’ আমি তাড়া লাগালাম বিনুদিদিকে।
‘কেন?’ বিনুদিদি একটু অবাক।
‘আরে, আমার বমি পেয়েছে, তাড়াতাড়ি একটা বেগুনি দাও, আমি খেতে খেতে বমি করতে যাব।’ আমার অকপট স্বীকারোক্তি।
কথা হয়েছিল আমার আর বিনুদিদির। কিন্তু কি করে যেন বাড়ির সবাই জেনে গিয়েছিল। আর আমার মুখ নিঃসৃত সেই বাক্যটা সবার মনে বসে গেল। আমাকেও ভুলতে দেয় নি। যখনই সবাই এক জায়গা হবে কেউ না কেউ একবার এই কথাটা বলবেই। আর আমাকে নিয়ে খুব একচোট হাসাহাসি হবে।
কিভাবে যেন আজ সেটা ভুলে আমি বেগুনির আর্জি জানিয়ে ফেলেছিলাম। আর পিছনে লাগার এমন সুবর্ণ সুযোগ কি কেউ ছাড়ে?
‘উফ, রিন্টুদির সেই বেগুনি খেতে খেতে বমি করতে যাওয়া! …’ বলতে বলতে সন্তু চোখের জল মোছে। খুব হাসলেই ওর চোখ দিয়ে জল পড়ে। আর ওর চোখ মোছা দেখে আমরাও হাসি।
‘রাহুলদাদা, তুমি কি এবার রান্নাটা শুরু করবে নাকি আমি করবো?’ হঠাৎ ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ানো নেহার প্রশ্ন শুনে রাহুল তড়াক করে লাফিয়ে উঠে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালো।
‘এবার বল, কেমন লাগছে মা? কেমন সারপ্রাইজ দিলাম বল? তোমাদের সবাইকেই সারপ্রাইজ দেবো বলে কাউকেই বলি নি অন্যদের আসার কথা।’ রাহুলের চোখে দুষ্টু হাসি ঝিকমিক করে।
‘তুই পারিসও রাহুল। ভীষণ ভালো লাগছে রে!’ জয়াদির গলায় খুশি ঝরে পরছে।
‘সত্যি, কতদিন পর! কি ভালো যে লাগছে!’ আমরা নানান স্বরে নানান সুরে বলে উঠলাম।
‘আরে, তোমরা বুড়োবুড়িরা সব আনন্দ পাবে বলেই না এরকম প্ল্যান করলাম। ভাবলাম তোমরা গল্প করে আনন্দ পাবে, আর আমিও একটা দারুণ রেসিপি নতুন শিখেছি, সেটা তোমাদের বানিয়ে খাওয়াবো। কি, ভালো মতলব না?’
‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।’ সমস্বরে আমরা সবাই বলে উঠলাম।
‘আজ আমাদের এখানেই তোমাদের সবার ডিনার তাহলে? তোমরা গপ্পো কর, আমি যাই রান্নাঘরে।’ বলে শীষ দিতে দিতে রান্নাঘরের দিকে এগোল রাহুল। হঠাৎ শীষ দেওয়া থামিয়ে পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে মা’কে যেন একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল, ‘দেখি মা আজ বলতে পারে কিনা কি দিয়ে কি রান্না করছি।’
‘হয়ে যাক, হয়ে যাক আজকের মেনু ক্যুইজ।’ রাহুলের কথায় সজোরে হাততালি দিয়ে বলে উঠলো ঘনা। আর তাই শুনে আমরা সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম। আমি ভাবলাম সেই গন্ধ শুঁকে খাবারের নাম বলার খেলাটা তাহলে আজও চলছে।
সবার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম খুশি যেন উছলে পড়ছে। ভগবানের কাছে চুপি চুপি ছোট্ট একটা প্রার্থনা জানিয়ে রাখলাম, ‘এই খেলা যেন কোনদিনই শেষ না হয়।’

1 thought on “জয়াদির গন্ধবিলাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *