নীতা মণ্ডল

(১)

বস্তা থেকে পাঁচ কেজি করে চাল মেপে দিচ্ছে বাবা। সেগুলো প্যাকেটে ভরে মুখ বেঁধে আরও বড় একটা প্যাকেটে ভরছে অভিমন্যু। ওই বড় প্যাকেটে আরও কয়েকটা ছোট ছোট প্যাকেট ঢুকবে। সেগুলোয় থাকবে দুকেজি আলু, এক প্যাকেট মুড়ি, পাঁচশো গ্রাম পেঁয়াজ, পাঁচশো মুসুরডাল, আধ-লিটার সরষে তেল, আড়াইশো গ্রাম নুন, দুশো গ্রাম সয়াবিন, পাঁচটা মাস্ক আর একটা সাবান। যাদের কাছে প্যাকেটগুলো যাবে তাদের নামধাম লেখা আছে। সব ভরে মিলিয়ে নেবে অভিমন্যু। তারপর এক একজন, এক একটা গ্রামে পৌঁছে দিয়ে আসবে। বিশাল কোনও কর্মকাণ্ড নয়। নিজেদের গ্রাম ধরলে মোটে চারটে গ্রাম। সব মিলিয়ে পনেরোজন মানুষ। ওদের পরিবারে উপার্জন করার কেউ নেই। কারো খাটাখাটনির ক্ষমতা নিঃশেষ, কেউ পরিজনহীন আর কেউ পরিবার থেকে বিতারিত। হাবাগোবা স্বল্পবুদ্ধিও আছে দুএকজন। কোনোদিনই তারা আজ খেয়ে কাল কী খাব ভাবে নি।

অভিমন্যুর ‘আমরা কজন’ এদের আবিষ্কার করেছে বছর ছয়েক আগে। তখন থেকে নিয়মিত সাহায্য করে আসছে ওরা। খাবার বা ওষুধের ব্যবস্থা করা ছাড়াও ওরা খবর রাখে, বর্ষায় চালের ফুটো দিয়ে জল পড়ছে কিনা, শীতে লেপ কম্বল আছে কিনা! তারপর দরকার মতো যোগান দেয়। অভিমন্যু টাকার ব্যবস্থা করে। ওর ছোটবেলার বন্ধু অরূপ, বিশু আর শ্যামল শ্রম দেয়। চাকরিতে যোগ দেবার সময় অভিমন্যু ভেবেছিল, দলটা বোধ হয় ভেঙেই যাবে। কিন্তু তা হয় নি অরূপ-বিশুরা আছে বলেই।

‘এই মুহূর্তে মানুষগুলোকে অন্তত সপ্তাহ দুএকের রসদ পৌঁছে দিতেই হবে। খেটে খাওয়া মানুষের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আর পনেরোজন মাত্র নয়, বিপদে পড়েছে অসংখ্য মানুষ। কিন্তু এই সামান্য ক্ষমতায় কজনের পাশেই বা দাঁড়ানো যায়!’ এইসব কথা ভাবতে ভাবতে সে প্যাকেটগুলো ভর্তি করছিল। দোল উপলক্ষে ছুটি নিয়ে বাড়ি এসে আটকে গিয়েছে। প্রথম দিকে ছুটি বেড়েছিল, পরে বাড়ি থেকেই কাজ চলছে। ছাদের চিলেকোঠার ঘরে ইন্টারনেট পেতে অসুবিধা হয় না। এমন কঠিন সময়ে সে নিজে রোজগারের দিক থেকে নিশ্চিন্ত।

হঠাৎ বাইরে গোলমাল শুনে অভিমন্যু দাঁত খিঁচিয়ে উঠল, ‘বুড়োভাম আপদের দল! পুলিশ এসে থানা না গাড়লে সবকটা মরত! দুটোদিন না বেরোলে, গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করে এর ওর পেছনে কাঠি না দিলে পেটের ভাত হজম হয় না!’

গ্রামে কজন লোকের প্রতি অভিমন্যু বীতশ্রদ্ধ। তাদের উদ্দেশ করে গজগজ করতে করতে মাস্কটা পরে বেরিয়ে এল। যা ভেবেছে তাই। গাছতলায় ভিড়। পাকারাস্তা থেকে বেরিয়ে মোড়াম রাস্তাটা যেখানে গ্রামের ভেতর ঢুকেছে সেটাই গাছতলা। সামান্য এগিয়ে মোড়ামের রাস্তাটা ইংরাজীর ওয়াই অক্ষরের মতো দুটো ভাগ হয়ে গিয়েছে। একটা ঢুকেছে অভিমন্যুদের পাড়ায়। ভদ্রলোকের পাড়া। লোকজন সচ্ছল মধ্যবিত্ত। সবার জমিজমা আছে। সারাবছরের চাল, ডাল, আলু, তেলের যোগান জমি থেকেই হয়। দু’এক জন ছোটখাটো চাকরি করে। দু’এক জনের রাস্তার ধারে দোকান আছে।   

অন্য শাখাপথটি গ্রাম ছাড়িয়ে মাঠের দিকে গিয়েছে। মাঠ অর্থাৎ কৃষিখেত। খেত আর গ্রামের সীমানায় থাকে কঘর বায়েন আর বাগদী। এই ছোট বসতির নাম বায়েনপাড়া। পরপর তিনটে পুকুর ভদ্রলোকের পাড়ার সঙ্গে এ পাড়ার দূরত্ব অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। চট করে এপাড়া ওপাড়া করা যায় না। বেশ খানিকটা ঘুরে যেতে হয়। এই ব্যবধান কেবল দূরত্বের নয়। এ ব্যবধান সামাজিক এবং অর্থনৈতিক। বায়েনপাড়ার লোকের মাথা গোঁজার জায়গা থাকলেও উপার্জনের জন্যে তারা নির্ভর করে অন্য পাড়াটির উপর। ওদের জমিতে অথবা বাড়িতে খেটেই এদের দিন চলে।

অভিমন্যু হনহন করে এগিয়ে গেল ভিড়টার দিকে। ওর সপ্রতিভ হাবভাব, হাঁটাচলা বা মুখের ভাষায় বিশ্বাস করা কঠিন যে ও এই গ্রামেরই ছেলে। বছর পাঁচেক হল দিল্লীতে আছে। তার আগে কলকাতায় পড়াশুনো করেছে বহুদিন। বছর দশেক তো হবেই। লেখাপড়ার সূত্রে বিদেশেও গেছে। অভিমন্যুকে দেখেই কজন সরে দাঁড়াল। পরস্পরের দূরত্ব বজায় রাখার কথাটা যেন হঠাৎ মনে পড়ে গিয়েছে ওদের। ফাঁক গলে বেরিয়ে এল একজন পুলিশ। লাঠি হাতে এই জটলা ভাঙতে সে এতক্ষণ হিমশিম খাচ্ছিল।

অভিমন্যু জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে?’

হারাধন পাল আগ বাড়িয়ে বলল, ‘এর মধ্যে তোমার আসার দরকার নাই বাবা। তোমার কাজকম্ম আছে, তুমি সেসব দেখ। আমরা গাঁয়ের মানুষ, গাঁয়ের ভালোমন্দ আমাদিকেই দেখতে দাও।’

স্বঘোষিত মোড়ল হারাধন পাল সেই শ্রেণীর মানুষ, যারা বিত্তের অহংকারে ধরাকে সরা জ্ঞান করে। ঝামেলার গন্ধ পেলে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজের নাকটি গলিয়ে দিয়ে পরিস্থিতিকে ঘোরালো করে তুলে আমোদ পায়। তাদের ভিড়ে অভিমন্যু মূর্তিমান ছন্দপতন। ওদের সঙ্গে বাদ-বিবাদের সামান্য ইচ্ছে অভিমন্যুরও নেই। তাই বলে মহামারীর সময় ভিড় করলে প্রতিবাদ করবে না!

অভিমন্যু বলল, ‘আপনার মতো করে গাঁয়ের ভালোমন্দ আর কে বোঝে? তবে পুলিশ এই গাঁয়ের মানুষের জন্যে কাজ করছে যখন ওদের কথাটা তো আমাদের মানতে হবে। এমন ভিড় করলে…’

সেদিনকার সেই পুঁচকে ছোঁড়ার কথার প্যাঁচ দেখে হারাধনের পিত্তি জ্বলে গেল। জ্বলন্ত দৃষ্টিতে অভিমন্যুকে আগাপাশতলা দেখতে লাগল হারাধন। ইচ্ছে হল এক চড়ে ছোঁড়ার গাল লাল করে দেয়। 

হারাধনের চাউনি দেখে একটা গোলমালের আঁচ পেল অভিমন্যু। হঠাৎই ওর মনে পড়ে গেল একটা পুরনো ঘটনা। কত বয়স হবে তখন অভিমন্যুর? চার কি পাঁচ। দাদুর সঙ্গে বিকেলে বেড়াতে বেরিয়েছিল। এরকমই একটা ভিড় ছিল সেদিন। ভিড়ের অভ্যন্তরে কী ঘটছে তা দাদুর কাঁধে বসে থাকার ফলে ও পরিষ্কার দেখতে পেয়েছিল। একদল লোক গোল হয়ে ঘিরে রেখেছিল বাগদীপাড়ার একজন মাঝবয়সী মহিলাকে। সেদিনের ঘটনার সূত্রপাত অভিমন্যুর জানার অথবা বোঝার কথা নয়। কিন্তু ঘটনাটা আজও গ্রামে চর্চা হয় তাই ও জানে। সেদিন মাঠ ফেরতা বাগদীবউকে একলা পেয়ে রসিকতার ছলেই হারাধন বলেছিল, ‘আঁচলে অতো কী রে?’

বাগদীবউ বলেছিল, ‘কেনে? শাগ। আঁচল দেখার নাম করে খপরদার গায়ে হাত দেবে না, বলে দিছি।’

বাগদীবউয়ের সতীপনা দেখে হারাধনের মাথা গরম হয়ে যায়।

‘সেয়ানা মাগী! যেন বুকের কাপড় খুলতে বলেছি!’ বলে আঁচল ধরে টান মারে হারাধন। অমনি শাকের সঙ্গে ঝরঝর করে ঝরে পড়ে কেজি দুএক ধান। চোখ লাল করে চেঁচিয়ে ওঠে হারাধন, ‘জমির আলে শাগ তোলার নাম করে ধান চুষেছিস? শালী চোর…’  

‘চোর’ কথাটা বাতাসের চেয়েও দ্রুতবেগে ছুটে গিয়েছিল গাঁয়ে। লোক জুটেছিল। ভিড় জমেছিল। অভিমন্যু দেখেছিল মায়ের চেয়েও বড়, কালো মোটাসোটা মানুষটা দুটো হাঁটুর ভেতর মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কাঁদছে। পরনের ছেঁড়া ময়লা কাপড়টা টেনে খুলে নিল কজন। গায়ে ব্লাউজ নেই। খোলা শরীরটা আরও গুটিয়ে গেল। যেমন কেন্নোর গায়ে কাঠি ঠেকিয়ে দিলে গুটলি পাকিয়ে যায় সেই রকম। হারুজ্যাঠ্যা বলল, ‘তোল মাগীর সায়া। লোহা পুড়িয়ে আন। ছ্যাঁকা খেলেই দেখ অভর পেট ভরে যাবে।’

পরে অভিমন্যু মাকে আক্ষেপ করতে শুনেছিল, ‘আহা, অভাবী মানুষ! কটাই বা ধান! ও তো হাঁসেই একবেলায় খেয়ে যায়! ওরা কি স্বভাবে চোর? যা করেছে অভাবে। ভগবানই এর বিচার করুক। মানুষের এই তো বিচার। জলে কাদাতে ভূতের খাটনি খেটে যারা চাষ করে, তাদের ঘরেই ফসল ঢোকে না!’

মনে মনে একটা মোক্ষম গালি দিয়ে হারাধনসহ ভিড়টাকে পেছনে রেখে অভিমন্যু এগিয়ে গেল। দেখল অন্য পুলিশটা একজন বুড়িকে টেনে রাস্তায় তুলেছে। বুড়ি কাঁদছে ‘আমার মুখে খানিক বিষ ঢেলে দাও বাবা গো… মেরে দাও গো আমাকে…’

অভিমন্যু ছুটে গেল। ওর মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এল, ‘যমুনা পিসি! তুমি কোত্থেকে?’

পুলিশ বৃদ্ধাকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কান্নায় আকুল বৃদ্ধার দন্তহীন ফোকলা মুখ ভরে গেল অনাবিল হাসিতে। সে বলে উঠল, ‘কবে এলে বাবা গো? কতদিন দেখি নাই তোমাকে। নামুনেরা তোমাকে গাঁয়ে ঢুকতে দিলে? দেবে না? না দিলে মাথায় বজ্জাঘাত হয়ে, ধরফরিয়ে মরত পাপিষ্টেরা।’

পুলিশ অভিমন্যুকে বলল, ‘বুড়ি হেব্বি সেয়ানা স্যার। গাঁয়ে ঢুকবে বলছে অথচ কোথা থেকে আসছে ঠিক করে বলছে না। একবার রামপুরহাট, একবার কোটাসূর, একবার গুনুটিয়া বলছে। বাইরের লোক যাতে গাঁয়ে না ঢোকে সেটা দেখা আমাদের ডিউটি। তাছাড়া আপনাদের গাঁয়ের লোকেও চায় না…’

ভিড় থেকে আওয়াজ উঠল, ‘গাঁয়ে ঢুকতে দোব না। আমরা পুলিশের সঙ্গে আছি!’

‘ও বাইরের লোক নয়। ছেড়ে দিন।’ অভিমন্যু এমন জোর দিয়ে বলল মনে হল যমুনা ওর আত্মীয়া।   

(২)

‘আমরা কজন’ এর সুবাদে এমন অনেক অকিঞ্চিৎকর মানুষ অভিমন্যুর আত্মীয়-আত্মীয়া হয়ে উঠেছে। ‘আমরা কজন’ তাকে ছোটদের কাছে হিরো আর মহিলাদের কাছে ‘সোনার ছেলে’ বানিয়েছে। গ্রামে না থেকেও ছেলেটা গ্রামকে, গ্রামের মানুষকে কত ভালোবাসে!

কথাটা এক অর্থে সত্যি। এখন সে গ্রামকে ভালোবাসে। আগে তার এসব অনুভূতি ছিল না। গ্রামের লোকও তখন তার এই টান লক্ষ্য করেনি। ছোটতে সে বই-মুখো, ঘরকুনো আর মায়ের নেওটা ছিল। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশাও তেমন করত না। ও ছেলে বড় হয়ে চাকরি জুটিয়ে গাঁ থেকে পালাবে সে বিষয়ে সবাই নিশ্চিত ছিল।

গ্রামের লোকের ভাবনা ভুল প্রমাণ করার জন্যেই যেন অভিমন্যু পড়া শেষে গ্রামে এসে থাকতে শুরু করেছিল। সেবার এই গাছতলার মজলিশ ভরে উঠেছিল খুশির বাতাসে। সে খুশি ছিল অভিমন্যুর ব্যর্থ ভবিষ্যতের কল্পনায়। হারাধন বলেছিল, ‘শিক্ষিত! অ-নে-ক দূর লেখাপড়া! আসলে কাজকর্ম জোটে নাই। বুঝলে না? আজীবন বেকার হয়ে গাঁয়েই থাকবে, মিলিয়ে নিয়ো আমার কথা।’

এর কদিন বাদেই হারাধন গিয়েছিল অভিমন্যুদের বাড়ি। ঢুকেই দেখেছিল ফ্যালা বায়েনের ছেলে আর আশা বাগদির ছেলেকে পড়াচ্ছে অভিমন্যু। আনন্দে আত্মহারা হারাধন গাছতলায় এসেছিল। বলেছিল, ‘বাব্বা, গাঁয়ের সেরা ছাত্র! সারাজীবন যদি ছোটলোকদের মাষ্টারি না করে, আমি কান কেটে দোব।’

হারাধনের আনন্দের কারণ তার বহুকালের জমানো ঈর্ষা। ওর ছেলে সঞ্জয় অভিমন্যুর সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ত। শ্যামল, বিশু, অরূপরাও পড়ত। কিন্তু ওরা কেউই বিদ্যাবুদ্ধিতে অভিমন্যুর সমকক্ষ ছিল না। তাতে কারোর কোনও অসুবিধা হয় নি। দশ-বিশ বছরে ওরকম দুএকজন ছাত্র গ্রামে জন্মায়। সবাই জানে সেটা ব্যতিক্রম। সেই জন্যে শ্যামল বা বিশুর মতো সাধারণ ছেলেদের মা বাপের কোনও আক্ষেপ থাকে না। কিন্তু হারাধনের আক্ষেপ হল। অভিমন্যু যখন কলকাতায় পড়তে গেল গ্রামের লোক এমন ধন্য ধন্য করল!

হারাধন ভাবল ব্যাপারটা, ‘গাঁয়ে মেধো আর ভিনগাঁয়ে মধুসূদন’! তখন সে ছেলেকে পাঠাল বোলপুরে। সেখানে বাড়ি করে দিল। মুদি দোকান খুলে দিল। খাওয়া পরার ভাবনা তার নেই। তার পৈতৃক সম্পত্তি তিন পুরুষ বসে খেয়েও শেষ করতে পারবে না। কিন্তু গাঁয়ে ছেলে মান পাবে না, তা হবে না।

অভিমন্যু সেই বার বাড়ি এল পিএইচডির থিসিস জমা দিয়ে। পরদিন সকালে নিমের কাঠি দাঁতে গুঁজে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিল বায়েনপাড়া ছাড়িয়ে। গ্রাম শেষে আদিগন্ত মাঠ, শালুক ফোটা পুকুর, পুকুর পাড়ে বাঁশঝাড় সবকিছু কেমন যেন টেনেছিল ওকে। ছোটবেলার কথা মনে পড়েছিল। মনে পড়ছিল মা’র কথা। মা গ্রাম সম্পর্কে কত কথা বলত! তখন সেসব বুঝতে পারত না। মনে হল, কত ছোট ছোট ঘটনা মাকে পীড়া দিয়েছে! উচিত কাজ মা করতে পারে নি। উচিত কথা বলতে গেলে বাবা চুপ করিয়ে দিত। বাবা থাকত ক্ষমতাবান মানুষের দিকে। তারা যা বলত, বাবার কাছে সেটাই ন্যায্য। এক রকম গা বাঁচিয়েই লোকটা সারাজীবন পার করে দিল। অভিমন্যু এখন লোকটাকে করুণা করে। ভাবতে ভাবতে রাস্তার টিউবওয়েলে মুখ ধুতে গিয়ে অভিমন্যু দেখল, বায়েনপাড়ার বাচ্চারা কাঁচের গুলি খেলছে। গুলির মধ্যে দুএকটা কয়েন চকচক করছে। মা বলত, ‘লক্ষ্মীছাড়া খেলা।’

অভিমন্যু বলল, ‘এই সরস্বতীছাড়ার দল, সকালবেলায় এইসব খেলছিস, লেখাপড়া নেই?’

একজন বলল, ‘ইশকুল? সে তো দশটার সময়।’

‘তা ঘরে পড়াশুনো কখন হয় শুনি? স্কুলে পড়া দেয় না? হাতের লেখা? অঙ্ক?’

‘দেয় তো দেয়! না করলেও মাষ্টারে বকে না। বলে, এসেছিস তো মিডডে মিল গিলতে। গিলে উদ্ধার করে পালা। যাঃ। তোদের আর পণ্ডিত হয়ে কাজ নাই।’  

কী মনে করে অভিমন্যু বলল, ‘কাল থেকে সকালে না খেলে বই খাতা নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসবি। সকালবেলা খেলতে নেই, খেলতে হয় বিকেলবেলা।’

পরদিন একজন এল। আশাদির ছেলে। আশা ওদের বাড়িতে কাজ করে। ঝাঁট দেয়, ঘর নিকোয় আর বাসন ধোয়। অভিমন্যু পড়তে যেতে বলেছে শুনে ওর ছেলে ঘরে এসে হেসে গড়িয়ে পড়েছিল। কাঁচকলা দেখিয়ে বলেছিল, ‘গিয়ে বসে আছি! কাল অন্য জায়গায় খেলব, তাইলে দেখতে পাবে না।’

কথাটা শুনেই আশা ছেলেকে ধরে মেরে নিয়ে এসেছিল। আশার ছেলেকে হাঁ করে অভিমন্যুর কথা শুনতে দেখে ফ্যালাবায়েন তার ছেলেকে নিয়ে এসেছে। ফ্যালা ওদের বারোমেসে মুনিষ। প্রথম দুদিন শুধু গল্পই বলেছিল অভিমন্যু। বই খুলতে বললে পালিয়ে যাবে না, সে ভরসা পায় নি। ও বলেছিল কিছু বড় মানুষের গল্প। তারপর একদিন নতুন পেনসিল দিতে ওরা বইখাতা বের করেছিল। অভিমন্যু পরে রংয়ের বাক্সও দিয়েছে। বলেছে, ‘পড়তে যখন ভালো লাগবে না। যা মনে আসে আঁকবি আর রং দিবি।’

দুদিন পর কলকাতার মেসে ফিরে যাবে ভেবে এলেও আর মেসে ফেরা হয় নি। ছেলেদুটোর ছবি তুলে নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিল ফেসবুকে। তাই দেখে কজন ওর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তারা নিজে থেকেই সাহায্য করতে চায়। ওরা সব অভিমন্যুর কলেজের বন্ধু। ভালো চাকরি করে। মাসে পাঁচশ বা হাজারটাকা ওদের কাছে কিছু নয়।

সেই দিয়েই শুরু হয়েছিল পথ চলা। তবে মনে দ্বিধা ছিল, ‘অন্যের কাছে ভিক্ষা নিচ্ছি কিন্তু লাভ কি আদৌ হবে কিছু? ক্লাস থ্রির ছেলেমেয়েরা ঠিক করে একটা শব্দ লিখতে পারে না, যোগবিয়োগ জানে না। তাদের মন সত্যি কি পড়াশুনোর দিকে ঘোরানো সম্ভব?’ 

নিজের চাকরির চেষ্টা আর ওই বাচ্চাদুটোর লেখাপড়ার ফাঁকে অভিমন্যু সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। পুকুর, বাঁশবন, বর্ষায় ঘোলা জলে ভরা ক্যানেল, সবুজ চারাভরা ধানখেতের ছবি তুলত মোবাইল ফোনে। কখনও জমির আলে বসে চাষিদের সঙ্গে গল্প করত। কখনও কোনও ছোট্ট গ্রামের একেবারে শেষ বাড়িটায় গিয়ে উঠত। জল চাইলে হয়ত কোনও বৃদ্ধা বেরিয়ে আসত। জল খেয়ে, সেই বৃদ্ধার কথা শুনতে বসে যেত। এভাবেই কিছু নিঃসঙ্গ, সহায়হীন মানুষের সঙ্গে ওর আত্মীয়তা গড়ে উঠে।

তাদের যে সাহায্য করবে সে ক্ষমতা অভিমন্যুর ছিল না। স্কলারশিপের সামান্য জমা টাকা তখন তলানিতে। শিগগিরই চাকরি নিয়ে গ্রাম ছেড়ে যেতে হবে। তাহলে? মনে হয়েছিল, ‘এদের কথা শুনলাম, ভালোবাসা আশীর্বাদ নিলাম কিন্তু বিনিময়ে কিছু করব না!’

সামাজিক মাধ্যমের বন্ধুদের পাঠানো বাড়তি টাকাটা কাজে লেগেছিল তখন। সেই বন্ধুদের সূত্রে আরও কিছু সহৃদয় মানুষ জুটে গিয়েছিল। অরূপ আর বিশুর কাছে ও তখনই সাহায্য চেয়েছিল। পয়সাকড়ি নয়, ওর কাজে হাত লাগাতে হবে। অভিমন্যু যে ওদের কাছে সাহায্য চাইবে একথা ওদের ভাবনার অতীত ছিল। বন্ধু হলেও এখন অভিমন্যুকে ওরা সমীহ করে। ওরা বলেছিল, ‘কী করতে হবে বল? আমরা আছি।’ তারপরই গড়ে উঠেছিল ‘আমরা কজন’।

হারাধন অভিমন্যুর বাবাকে সাবধান করেছিল, ‘একটাই বেটা ভাই। কথায় বলে, শিবরাত্রির সলতে। শিক্ষিত ছেলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবে! ভালো চাও তো আটকাও। বিয়ে দিয়ে দাও।’ 

অভিমন্যুর বাবা জানত, তাতে লাভ নেই। একগুঁয়ে ছেলে, নিজে যা ভালো বুঝবে তাই করবে। বাপের মত নিয়ে সে কোনও কাজ করে না। সেই কোনকালে কলকাতায় পড়তে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল বলে বাপের কাছ থেকে একটা পয়সা নেয় নি। ছেলে পড়িয়ে নিজে লেখাপড়া করেছে। বাড়ি এলে বাপের সঙ্গে দুটো ভালোমন্দ কথা পর্যন্ত বলে নাই। এবারে এল ঝাড়া এক বছর পর। নিজের মর্জিতেই গাঁয়ে থাকছে। তাকে খুঁচিয়ে মরবে? তাই হারাধনের কথার কোনও উত্তর ওর বাবা দেয় নি।  

ছমাস পর চাকরি পেয়ে চিন্তায় পড়েছিল অভিমন্যু। শ্যামল, বিশু, অরূপ বলেছিল, ‘আজকের দিনে দিল্লী আবার দূর নাকি? তু নিশ্চিন্তে যা তো। আমরা আছি। আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিস, এবার তেল আর সলতে জুগিয়ে যা। আমরা ঠিক সময়ে তেল ঢেলে দেব, পলতে উসকে দেব।’

 (৩)

ভিড়টা ছোট ছোট দল ভাগ হয়ে গিয়েছে। সবাই নিজের মতামত দিচ্ছে। হারাধন হম্বিতম্বি করছে। যমুনা অভিমন্যুকে পেয়ে নতুন উদ্যমে উঠে বসেছে। ক্লান্ত ভগ্নদেহ যমুনার গলা থেকে বেরিয়ে আসছে তীক্ষ্ণস্বর। মরাকান্নার মতো সুর করে সে বিলাপ করছে। বলা বাহুল্য সে বিলাপ নির্ভেজাল দুঃখের নয়। পুলিশ থেকে হারাধন সবাইকে গাল পাড়ছে কান্নার মাধ্যমে, ‘বাবা গো… এরা কী পাষাণ গো…আমি গাঁয়ের বিটি হয়ে কোতাকে যাবো গো…হারামজাদা, হনুমুখো, বাঁশবুকো পুলিশ আমাকে মেলে গো…আমাকে মেরে খালভরা পুলিশ কী সুখ পেলে গো…ভগমান তুমি গাঁয়ের শকুনিটোর বিচের করো গো… নামুনে যেন করুণা হয়ে, দম আটকিয়ে, ধরফরিয়ে, হোসফোঁস করে মরে গো…’

অভিমন্যু বলল, ‘চুপ করো যমুনাপিসি। কোথাও যেতে হবে না। গাঁয়ের মানুষ তুমি, গাঁয়েই থাকবে।’

তারপর ভিড়কে উদ্দেশ করে বলল, ‘শোন গাঁয়ে কেউ ঢুকতে পারবে না, এমন নয়। গাঁয়ে ঢুকে আলাদা থাকলেই হবে। কারোও সঙ্গে মেলামেশা করবে না, ঘর থেকে বেরোবে না। আইসোলেটেড হয়ে, মানে পুরোপুরি আলাদা হয়ে থাকলে তোমাদের কারোর কোনও ভয় নেই। আর এই সময় দরকার ছাড়া তোমরাও বেরিয়ো না। আজকেও বেরিয়ে এসে ভিড় লাগিয়ে ঠিক কর নি। তাছাড়া যমুনাপিসির অবস্থাটা তাকিয়ে দেখ। এখান থেকে তাড়িয়ে দিলে মানুষটা মরে যাবে যে।’   

ভিড়টা হঠাৎ চুপ করে গেল। অভিমন্যু দেখল সেই ভিড়ের একপাশে ওর বাবা দাঁড়িয়ে আছে। নির্বাক। আরও একজন নির্বাক হয়ে চেয়ে আছে। সে সাধনা, যমুনার মেয়ে। ভিড় থেকে দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে ও। স্বাস্থ্যবিধি নয়, এ চিরাচরিত সামাজিক দূরত্ব।

অভিমন্যু বলল, ‘সাধনাদি? তোমার মা! তুমি কিছু বলতে পারছ না, হাঁ করে দেখছ? যমুনাপিসি নিজের ঘরেই থাকবে। খাবার আমি গিয়ে দিয়ে আসব। তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি শুধু বল…’   

সাধনা উত্তর দিল না। হারাধনকে দেখল। যমুনার শাপমন্যি শুনে সে রাগে ফুঁসছে। এক গাঁ লোকের মাঝে ওকে অমান্যি করলে, তার মূল্য দিতে হবে। হাতে না মারলেও, ভাতে মারবে বদমাশ লোকটা। এত লোক না থাকলে অনায়াসে হারাধনকে পটিয়ে নিত সাধনা। কিন্তু এখন তা হবার নয়।  

অভিমন্যু পুলিশকেই বলল, ‘আমি বলছি, ছেড়ে দিন ওকে। ও এই গ্রামের মানুষ, উপকারী মানুষ।’

পুলিশ দুজন শিকারির মতো ঘুরেছে কদিন। লকডাউন ঘোষণা হতেই ওদের ডিউটি পড়ল এই গাঁয়ে। সেদিন থেকে বড্ড হয়রান করছে গাঁয়ের লোকে। থলে হাতে বাজারে যাবার নাম করে বেরিয়ে পড়ছে যখন তখন। রাস্তার একপ্রান্তে কাউকে ঘরে ঢোকাতে গেলে অন্যপ্রান্ত থেকে কেউ ঝোলা হাতে বেরিয়ে আসছে। তার দিকে গেলে এদিক থেকে আবার বেরিয়ে পড়ছে কেউ। একই সঙ্গে পাড়ার ভেতর আর রাস্তার ধারের দোকানগুলোর উপর নজর রাখতে নাজেহাল দশা। অবশ্য অভিমন্যু আর ওর সাকরেদরা সহযোগিতা করছে প্রথমদিন থেকেই। কিন্তু এই অভিমন্যুই আবার দুপয়সা উপরির গোড়া মেরে দিয়েছে। জ্যাঠামশায়ের মতো গম্ভীর গলায় সাবধান করেছিল, ‘অনেকে অনেক লোভ দেখাবে, দরকারি  জিনিস বাদে লুকিয়ে চুরিয়ে আর কিছু বেচাকেনা হলে কিন্তু ফল ভালো হবে না। জনগণের স্বার্থে সরকারের নির্দেশ পালন করা আপনাদের, আমাদের সবার কর্তব্য।’

তার দুদিন পর কাপড় আর গয়নার দোকানের মালিক ধরেছিল ওদের। দোকানের সাটার নীচ থেকে একহাত তোলা থাকবে। খদ্দের এলে তাকে ভেতরে ঢুকিয়ে নেওয়া হবে। বিনিময়ে প্রতিদিন রাতে মুরগির ঝোল-ভাত আর কমিশন। সে প্রস্তাব গ্রহণ করা যায় নি। কোথায় কোথায় অভিমন্যুর হাত আছে তা জানা ছিল না। উপর মহলের অনুমতি নিয়ে গ্রামে গ্রামে কাজ করছে। হাত ধোয়া, মাস্ক পরা শেখাচ্ছে। প্রচার করছে, ‘সব দায়িত্ব প্রশাসনের নয়। সব দায় ডাক্তারের নয়। সবাই সচেতন হোন। নিয়ম মেনে চলুন। অকারণে ঘরের বাইরে বেরিয়ে বিপদ ডেকে আনবেন না। ’

ওর কথাগুলো অমান্য করতে না পারলেও লোকসানের জ্বালাটা মেটে নি। আজ বুড়িটাকে বাগে পেয়ে মনে হল, সব লোকসানের হিসেব একে দিয়েই মিটিয়ে নেবে। আইনের প্যাঁচেই জবাব দেবে অভিমন্যুকে। একজন পুলিশ গলা তুলল, ‘আপনারা বলুন একজনের কথার ভরসায় ছেড়ে দেব? গ্রামের সবার বিপদের কথা ভাবব নাকি ভাবব না? আইন মানব নাকি মানব না?’

অভিমন্যু আনমনে ঘুরে দাঁড়াল ভিড়ের দিকে। কে কী বলল, কিছুই ওর কানে ঢুকল না। যমুনাবাগদীর কথা মনে ভাসছে। বংশ পরম্পরায় এই গ্রামের বাসিন্দা যমুনা। বায়েনপাড়ার এক কোণে ওর কুঁড়েঘরটা এখন জরাজীর্ণ। মেয়ে সাধনা গ্রামে থাকলেও যমুনা নিজের ভাঙা ঘরেই থাকে। চিরকালের স্বাধীনচেতা মানুষ। না পোষালে যখন তখন কাজের মুখে ‘নাথি’ মেরে পালিয়ে আসে। যমুনার মায়ের নাম আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে। ওর মা গঙ্গাদাই ছিল এ তল্লাটের নামকরা ধাত্রী। শুধু যে প্রসব করানোয় সিদ্ধহস্ত ছিল তা নয়। সদ্যোজাত ও প্রসূতির যত্ন আর পরিচর্যা করত প্রশিক্ষিত নার্সের মতো। প্রসূতির স্বাস্থ্য দেখে নির্ভুলভাবে তার বিশ্রাম ও যত্নের নিদান দিত। গ্রামের মেয়েবৌরা তার হাতে পড়লে নিশ্চিন্ত হতো। গঙ্গাদাইয়ের নাম গ্রাম ছাপিয়ে ব্লক হেলথসেন্টার পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। সেখান থেকে ট্রেনিং নেবার ডাক পেয়েছিল। ট্রেনিং শেষে হাসপাতালে আয়ার কাজও পেয়েছিল। কিন্তু সে কাজ গঙ্গাদাই করে নি। কারণ সেও ছিল স্বাধীনচেতা। যমুনা তার মায়ের পেশায় টিকতে পারে নি। দিনকাল পালটেছিল। দাইয়ের পেশাটাই উঠে গিয়েছিল যমুনার আমলে। তবুও যমুনা আপন মর্জির মালিক। তাকে কেউ এক জায়গায় বাঁধতে পারে নি। বিয়ের পর নিজেই একদিন স্বামীর ভাত ছেড়ে, মেয়ে বগলে গাঁয়ে ফিরে এসে বলেছিল, ‘এ গাঁয়ের সঙ্গে আমার লাড়ের টান। আমি এখানেই থাকব।’

গ্রামে প্রায় সবার বাড়িতেই কখনও না কখনও ঝিয়ের কাজ করেছে যমুনা। চাষ করেছে, পুকুর কেটেছে, গাঁয়ে রাস্তা হবার সময় মশলা মাখা গলা পিচ মাথায় করে বয়ে নিয়ে গিয়ে ঢেলেছে। গাঁয়ে কাজ না থাকলে শহরে গিয়েছে। হাতে দুপয়সা আসতেই আবার ফিরে এসেছে গাঁয়ে। পয়সা ফুরোলে আবার গিয়েছে। এমন উড়ে বেড়ানো স্বভাবের জন্যে ওদের মা মেয়ের নামে গাঁয়ের লোকে ছড়া বেঁধেছিল, ‘গঙ্গা যমুনা চন্দনা, পোষ মানে না তিনজনা।’ অর্থাৎ চন্দনা পাখির মতই যমুনা মুক্তপ্রাণী।

অভিমন্যুরা যখন ‘আমরা কজন’ তৈরি করেছে, খবর পেয়ে চলে এসেছিল অভিমন্যুর কাছে। বলেছিল, ‘বাবা রভি, তোমার এইটো কেমন বিচের হল? গাঁয়ে দুঃখী, অভাবী মানুষের অভাব? তুমি বিরেণা গাঁয়ের লোককে বস্তোদান করবে, কম্বলদান করবে! আমি কী দোষ করলাম বাবা?’

দলে কথাটা উত্থাপন করতেই বিশুরা আপত্তি করেছিল, ‘যমুনাপিসির মেয়ের অবস্থা ভালো, তাছাড়া যমুনাপিসি নিজে এখনও কাজ করে। ওকে দিলে পাড়া ঝেটিয়ে সবাই আসবে তখন কী করবি?’

অভিমন্যু যমুনার নামটা খাতায় লিখে বলেছিল ‘ওর নামটা থাকল। তাছাড়া বুড়ি হয়েছে, আর কদিন কাজ করতে পারবে?’

হারাধন পালের হেঁড়ে গলার স্বরে অভিমন্যুর বাহ্যজ্ঞান ফিরে এল। ‘কোন শালার কতবড় বুকের পাটা দেখব। একবার মাগীকে গাঁয়ে ঢুকিয়ে দেখ। আইন না মানলে বাপের বিয়ে দেখিয়ে দোব।’

একজন সায় দিল, ‘হক কথা। একজনের জন্যে গোটা গাঁ বিপদে পড়বে, এটা হতে দোব না।’

‘কী যা তা বলছেন?’ অভিমন্যু আর ভদ্রতা বজায় রাখতে পারছিল না। আকুল হয়ে ও ভিড়ের মধ্যে অরূপ, বিশু আর শ্যামলকে খুঁজছিল। অরূপ আর শ্যামল নেই। বিশু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

অভিমন্যু গলা নামিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, আমি বুঝিয়ে বলছি আপনাদের। দায়িত্ব নিয়ে বলছি। যমুনাপিসি আলাদা থাকলে কেন কোনও ভয় নেই! আসলে কোভিড ভাইরাস ছড়ায় …’

ছোকরার বলার ভঙ্গিটা ভালো। আবার সম্মান দিয়ে আপনি-আজ্ঞে করে বলছে! দুচারজন শুনবে বলে কান খাড়া করলেও হারাধন চেঁচিয়ে উঠল, ‘আবার পাকামি মারছ? গাঁ কি তোমার বাপের জমিদারী?’

‘আমরা বাবা তোমার খাসতালুকের প্রজাও নই, পাঠশালার ছাত্রও নই।’ বলে খিক খিক করে হাসল একজন। তারপর গোটা ভিড়টাই একজোট হয়ে গেল। অভিমন্যু আর ওর বাবাকে দেখতে পেল না।

যমুনা আবার কেঁদে উঠল, ‘ওগো তিনমাস হয়ে গেল গো … আমি আমার বিটির মুখটো দেখি নাই গো… ওগো সবাই বললে মা করুণার দয়া হলে মরে যাবো গো… শুনে আমি রেতের আঁধারে পালিয়ে এলাম বিটিটোকে দেখব বলে গো… ’

অভিমন্যু বলল, ‘শুনলেন তো? আপনাদের যাদের ছেলেমেয়েরা বাইরে আছে, তাদের টেনশন হচ্ছে না? মন খারাপ করছে না? বেচারী কি আর অত ভেবেছে? চারিদিকে নানা রকম কথা শুনে ভয় পেয়ে পালিয়ে এসেছে… হারুজ্যাঠা আপনি বোঝেন না? এর মাঝে সঞ্জয়ও তো এল। কেউ আপত্তি করেছে? আপনি ঘরে ঢুকতে দেন নি? তাহলে একজন বুড়ো মানুষের প্রতি এই অবিচার কেন?’

হারাধনের তালে তাল দিয়ে যারা কথা বলছে সবাই জানে, দুদিন আগে ওর ছেলে বোলপুর থেকে এসেছিল। রাতের আঁধারে মেঠো রাস্তা ধরে পেছনের বাঁশবন দিয়ে ঢুকেছিল। ঘর থেকে বেরোয় নি। খবরটা মুখে মুখে ছড়িয়েছিল। পরদিন রাতে গাছের আম, পুকুরের মাছ নিয়ে ফিরে গিয়েছে সঞ্জয়।

উচিত কথাটা এমন মুখের উপর কেউ বলবে হারাধন ভাবতে পারে নি। ক্ষণেকের জন্যে থমকেই গর্জন করে উঠল, ‘পুলিশ হও আর যেই হও। বুড়ি গাঁয়ে ঢুকলে, আমি থানায় তোমাদের নামে নালিশ করব।’  

পুলিশ দুজন কথা না বাড়িয়ে যমুনাকে টেনে নিয়ে গেল বড় রাস্তার দিকে। যমুনা চেঁচাল, ‘ওগো আমার মুখে খানিক বিষ ঢেলে দাও গো… মেরে দাও গো আমাকে…আমার বিটিকে দেখতে পেয়েছি গো…গাঁটোকেও দেখে নেলাম গো… আমি আর কিছু চাই না গো …’  

(৪)

একটা দুরন্ত ক্রোধে অভিমন্যু পালিয়ে এসেছিল। ঘরে ঢুকেই কাঁধে একটা ঝোলা তুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বাবা এসে পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ঘর ঢোক। যাস না।’

বাবাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ও বলল, ‘খবরদার আমাকে এই অমানুষের গাঁয়ে থাকতে বলবে না। তোমাদের মত ছোটলোক, কাপুরুষ গ্রামবাসীদের মুখে আমি মুতি। থু… থু… ’

হন হন করে হাঁটতে হাঁটতে অভিমন্যু কখন রাস্তায় উঠেছে নিজেই জানে না। গাছতলার উপর দিয়েই পেরিয়ে এসেছে কিন্তু ভিড়টা ভেঙ্গে গিয়েছে কিনা, পুলিশগুলো কী করছে, কিছুই চোখে পড়ল না ওর। কোনও শব্দ কানে ঢুকল না। ও দেখল যমুনা বড় রাস্তা ছেড়ে মাঠে নেমেছে। আলপথ ধরে ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটছে। অভিমন্যু ছুটে গেল। ওকে দেখে আলের উপর বসে পড়ল যমুনা। অভিমন্যু এক প্যাকেট বিস্কুট আর এক বোতল জল এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘কোথা থেকে এলে, কীভাবে এলে বল। এই শরীরে কোথাও যেতে হবে না তোমাকে। তুমি আমাদের বাড়িতে থাকবে। কেউ কিছু বলবে না। ওই বাঁশতলা দিয়ে ঢুকে পড়ব, পুলিশ দেখতে পাবে না। হারুজ্যাঠার বেটাও এসেছিল ওই দিকে।’

আকণ্ঠ জল পান করে যমুনা জানাল সে রামপুরহাট থেকে হেঁটে হেঁটে আসছে। কবে বেরিয়েছে বলতে পারল না। অভিদের পাড়ার মেয়ে পলির ছমাসের ছেলেকে দেখাশোনা করার জন্যে যমুনা এখন রামপুরহাটে থাকে। পলি আর পলির বর দুজনেই চাকরি করে কিনা! ‘ভালো খেতে পরতে পাবে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকবে। এই বয়সে আর মাঠে ঘাটে জলকাদা ঘাঁটতে হবে না।’ এইসব ভালো ভালো কথা বলে, এক রকম হাতে ধরে পলির বাবা-মা ওকে এ কাজে রাজী করিয়েছিল।

অভিমন্যুর খেয়াল হল পলির বাবাও আজকের ভিড়ে ছিল। নীরব দর্শক। শেষ পর্যন্ত কী হয় তাই দেখা ছাড়া যেন আর কিছু করার ছিল না ভদ্রলোকের।

যমুনা বলল, ‘যখুন আলামারা হয়েছি, গাছতলায় শুয়ে পড়েছি। চোখ লেগেছে। তারপর উঠে আবার হেঁটেছি। সোজা রাস্তায় যি আসব, সি উপায় নাই। পুলিশে লাঠি লিয়ে তেড়ে তেড়ে আসছে। নুকিয়ে নুকিয়ে, আদাড়-পাঁদাড়, বন-বাদাড়, অপথ-কুপথ মাড়িয়ে আসতে হল।’

অভিমন্যু দেখল যমুনার পাদুটো ফেটে, ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। বিস্কুটের প্যাকেট শেষ করে আবার জল খেল। তারপর গ্রামের দিকে ঘুরে কপালে ডানহাতটা রেখে গাছতলায় কী হচ্ছে দেখার চেষ্টা করল।

অভিমন্যু বলল, ‘সব ঘর ঢুকে গিয়েছে। এবার চল।’

যমুনা বলল, ‘না গো, আমি যাব না। এক পা যমের দুয়োরে বাড়িয়েই দিয়েছি বাবা, আমার কথা ভেবো না। আমি মলে কেরুর কিছু হবে না। দেখলে তো, আমার বিটিকে। ডাঁড়িয়ে ডাঁড়িয়ে দেখলে! হারা নামুনের ভয়ে একটো কথা বলতে পারলে না। আমরা ছেরক্কালই তোমাদিকি মেনেছি গো। আর বাবুরা দেখ! পেটভাতায় কত কাজ করে দিয়েছি তোমাদের। বিটি-বৌরা বিয়োলে সেবাযত্ন করেছি। কখুনও দুটো ভালো খেতে দিয়েছে, কখুনও আবার ছ (ছোঁয়া) লেগেছে বলে কাঁদিয়ে ছেড়েছে। সব প্যাটের দায়। এ দায় না থাকলে কেরুর দুয়োরে যাই গো? করুণা রোগ, কঠিন রোগ। আমি সেটো জানি…’

অনেকগুলো কথা এক সঙ্গে বলে হাঁফিয়ে ওঠে যমুনা। অভিমন্যুকেও যমুনা যে ওই বাবুদের প্রতিনিধি বলেই মানে তা দেখে রাগ হয়। তবুও সে গলা নরম করে বলে, ‘আর একটু জল খাবে?’

হাঁফ ছেড়ে যমুনা বলে, ‘ওই হারা হারামজাদা হল অজাতের শিরোমণি। ওর জন্যে তোমাদের পাড়ার আর পাঁচজনায় মজা মারে। লোককে মেরে, গাল দিয়ে, মেয়েদের ইজ্জত লিয়ে আমোদ করা ওর চিরকেলে স্বভাব। কোনোদিন খেটে খেয়েছে? বাপের সম্পত্তির গরমেই মলো। উ বাঁশবুকো আমাদের দুখ বুঝবে? সবাই তোমার মতো হয় না বাবা। তুমি হয়েছ তোমার মায়ের মতো। সি মা লক্ষ্মী একবেলার কাজ করিয়ে তিনবেলার খোরাক দিত। কতবার দুয়োর থেকে ডেকে মুড়ি, গুড় দিয়েছে! সেই জন্যে এই নিঘিন্যে গাঁয়ে তাকে থাকতে হয় নাই। সগ্যে গিয়ে সুখে আছে। তুমি ঘর যাও বাবা। মরার আগে আমি বিটিটোকে আর গাঁটোকে একবার দেখতে এসেছেলাম। দেখতে পেয়েছি, এবার যাই। আশিব্বাদ করি, আ-মাপা পেরমাই হোগ তোমার। তুমি বেঁচে থাকলে, কতজনা বাঁচবে!’

অভিমন্যু একটা ঝাঁকুনি অনুভব করে। কথাটা এতক্ষণ ও বুঝতে পারে নি। অপরিসীম ধিক্কারে গ্রাম ত্যাগ করছে যমুনাপিসি। ত্যাগ করছে নাক উঁচু গ্রামবাসীদের সংস্রব। যে কথাটা ও কিছুক্ষণ আগে বাবাকে বলে এসেছিল, সেটাই যমুনাপিসি কাজে করছে। অভিমন্যু ভেবেছিল যমুনাপিসি অসহায়।  এখন মনে হল, এরপরও যমুনাপিসিকে গ্রামে ঢুকতে বলা মানে অপমান করা। এই শরীরে কতক্ষণ হাঁটবে? কোথায় যাবে? এ প্রশ্নের কোনও উত্তর ওর কাছে নেই তবুও অভিমন্যু বলল, ‘সেই ভালো।’

যমুনা ওর বাঁকা কোমর নিয়ে উঠে দাঁড়াল। মুখ ফেরাল গাঁয়ের উলটোদিকে। সামনে বিস্তীর্ণ মাঠ। দূরে আকাশ নেমে মাটিতে মিশেছে। এক পা এক পা করে সেই দিগন্তের দিকে এগিয়ে গেল যমুনা।

নীতা মন্ডলের জন্ম বীরভূমের লাভপুর সংলগ্ন ইন্দাশ গ্রামে। বিপ্রটিকুরী উচ্চবিদ্যালয় ও বোলপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্মসূত্রে দেশের বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন সময় থেকেছেন। পেশা অধ্যাপনা। নেশা বই পড়া, গান শোনা ও আড্ডা দেওয়া। ফলে যা হল, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনাকে দেখে মনে হতে লাগল ‘ঠিক যেন গল্পের মত!’ আবার, কখনও আড্ডার ফাঁকেই মনে হল, ঘটনাগুলো জুড়ে দিলেই তো নতুন গল্প। বিভিন্ন ওয়েব পত্রিকা ছাড়াও ‘কথা সাহিত্য’, ‘দেশ’ এর মত বাণিজ্যিক পত্রিকায় অণুগল্প, ছোটগল্প ও বড় গল্প লিখেছেন। প্রকাশিত হয়েছে একটি উপন্যাসও।

1 thought on “সামাজিক দূরত্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *