অমৃতা চক্রবর্তী


‘রোল নাম্বার ওয়ান। ওহ সরি, রোল নম্বর টু।’
পায়েলের ‘প্রেজেন্ট ম্যাম’ বলা শেষ হতেই উঠে দাঁড়ালো মেধা – ‘ম্যাম, রোল নম্বর ওয়ান…’
মুখ না তুলেই চশমার ওপর দিয়ে ভুরু তুলে তাকালেন অপর্ণা ম্যাম – ‘আরে! আজ সূর্য কোনদিকে উঠেছে? দেখ, দেখ, তোমাদের ফার্স্ট গার্লের সময় হয়েছে স্কুলে আসার!’ মেধা মৃদুস্বরে বলার চেষ্টা করে, ‘ম্যাম, শেষ তিনদিন আমার জ্বর…’ গলায় ব্যাঙ্গের সুর অব্যাহত রেখে ম্যাডাম বলেন, ‘হ্যাঁ, নিশ্চই! প্রত্যেক সপ্তাহে যে তিনদিন প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস থাকে না, সেই তিনদিন করে যে তোমার নিয়মিত জ্বর আসে, সেটা আমার মুখস্ত হয়ে গেছে! এখন তো বায়োলজি প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসেও আসা ছেড়ে দিয়েছ, তাই ভাবলাম তোমার রোল কল করার আর প্রয়োজন হবে না। যাকগে, বসে পড়। রোল নম্বর থ্রি…’ মেধা বসে, আর সৃজনী উঠে দাঁড়িয়ে ভয়ে ভয়ে বলে, ‘প্রেজেন্ট ম্যাম।’

– ‘ওহ তুমিও শেষ দুদিন অ্যাবসেন্ট!’ ম্যাডামের গলায় এবার যেন হতাশা, ‘কত করে বলেছি, ওর পাশে বসবে না! ওর থেকে এই যেগুলো শিখছ না, তাতে ক্ষতি ছাড়া উপকার কিছু হবে না, এই বলে দিলাম। আমার আজ কুড়ি বছরের ওপর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা। স্কুলে না এসে শুধু প্রাইভেট টিউশন পড়ে কারোর কোনোদিন ভালো হয়নি, হবেও না।’
সৃজনী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। ওকে সত্যিই স্কুলটা কামাই করতেই হয়েছে। কাল ইংলিশ টিউশনে পরীক্ষা ছিল যে! বাংলা আর ইংরেজিটা পড়ার সময়ই হয় না সায়েন্সের এই সমুদ্র-সমান সিলেবাসের চাপে, তাই দুটো দিন ছুটি নিয়ে একটা বিষয় অন্তত তৈরি করে নিতে চেয়েছিল এইবেলা। কিন্তু মেধার সত্যিই জ্বর হয়েছিল। সৃজনীই টিউশনের ইংরেজি প্রশ্নপত্রটা পৌঁছে দিয়েছিল, যাতে ও বাড়িতে বসেই পরীক্ষাটা দিতে পারে। নাহলে বায়োলজি প্র্যাক্টিক্যালের দিন স্কুল কামাই করার মেয়ে ও নয়। কিন্তু অপর্ণা ম্যামকে সে কথা বোঝাবে কে!
ক্লাস শেষ হলে সৃজনী, স্নেহা আর তিথি শুরু করেছিল, ‘ম্যামের প্রবলেমটা যে কী…’ মেধা আজ তাতে যোগ না দিয়ে বলে ওঠে, ‘কাল থেকে আর আমার পাশে বসবি না তোরা। কথাও বলবি না দরকারটুকু ছাড়া।’
– ‘ কি বোকার মত রাগ করছিস মেধা! ম্যামকে তো জানিসই, ছাড় না!’
– ‘আজ নিয়ে তিনদিন বললেন যে আমার সাথে মিশলে তোদের ক্ষতি হবে। ওনার কুড়ি বছরের অভিজ্ঞতা – হয়তো সত্যিই আমি এতটাই টক্সিক!’ বলে আর কোনো তর্কের অবকাশ না রেখেই বেরিয়ে গেল ও ঘর ছেড়ে। পৌঁছে গেল লাইব্রেরির পিছনে আর স্কুলের সীমানা দেওয়ালটার মাঝের যে একফালি নির্জন জায়গা, সেখানে। কান গরম হয়ে গেছে ওর, চোখ ফেটে জল আসতে চাইছে রাগে, দুঃখে, অপমানে! নাহ্, এর জবাব দেবেই ও। কারোর সাথে মিশবে না, কারোর ক্ষতির কারণ হবে না। শুধু পড়াশোনা করবে আরও মন দিয়ে। খুব ভালো একটা নম্বর চাই ওর টেস্টে – এই অপর্ণা ম্যামের হাতেই।

টেস্টের মার্কশিটটা হাতে নিয়ে থমকে গেলো মেধা। গুটিগুটি পায়ে ফিরে এলো বটে ওর বেঞ্চে, কিন্তু চোখ সরাতে পারেনি এখনও নম্বরগুলো থেকে। বিশ্বাসই হচ্ছে না যে এই রেজাল্ট! আর মাত্র দু’মাস পর উচ্চমাধ্যমিক – জীবনের পরবর্তী ধাপগুলোর ভিত বলতে যা বোঝায় তাই; আর স্কুলের গণ্ডিতে শেষ পরীক্ষা ছিল এই টেস্ট – কে কতটা প্রস্তুত হতে পেরেছে সেই মহারণের জন্য, তার বিচার, কিন্তু –
প্রায় সবাই মার্কশিট পেয়ে গেছে এতক্ষণে। পিছনের বেঞ্চ থেকে তিথি আর স্নেহা চাপা গলায় খোঁচাচ্ছে, ‘কিরে, কত হয়েছে টোটাল? তুইই ফার্স্ট হয়েছিস তো?’ মেধা উত্তর না দিয়ে কিছুটা বিভ্রান্ত ভাবে তাকায় ওদের দিকে। অধৈর্য স্নেহা ওর হাত থেকে মার্কশিটটা নিয়ে চটপট হিসেব করে ফেলে, ‘এই তো, বেস্ট অফ ফাইভ করলে হচ্ছে, উম্ম…  তিনশো পঁচাশি।’ তিথি যোগ করে, ‘তার মানে মারিয়ার থেকে আট আর পায়েলের থেকে কুড়ি নম্বর বেশি! ফাটিয়ে দিয়েছ গুরু! দেখলি, বলেছিলাম না তোকে কেউ আটকাতে পারবে না? আজ তাহলে সুগার অ্যান্ড স্পাইসে ট্রিটটা কিন্তু…’
স্নেহা ওকে থামিয়ে দেয়, ‘কিন্তু মেধা, বায়োলজিতে…?’ মেধা ততক্ষণে বেঞ্চের ওপর হাত রেখে তার মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছে মাথা। কান দুটো গরম হয়ে উঠেছে ওর। তিথিও মেধার মার্কশিটটায় চোখ বুলিয়ে হতবাক। ওরা প্রায় সব প্রাইভেট টিউশনই একসাথে পড়ে। আর তাই জানে, ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছে থাকায় বায়োলজিটা মেধা বরাবরই যত্ন করে পড়ে। নিলয় স্যারের মত খুঁতখুঁতে লোকের কাছেও শেষ দুটো পরীক্ষায় আশিতে সাতাত্তর আর আটাত্তর পেয়েছে ও। সেই মেয়ে টেস্টে মাত্র চব্বিশ, মানে কোনরকমে পাস!

‘বায়োলজি ? মানে চন্দনা ম্যাডাম তো?’
‘উফফ! চন্দনা ম্যাডাম তো ইলেভেনে ক্লাস নিতেন। তোমাকে তাহলে সারাবছর কি বলা হলো?’ বাপির সাংসারিক উদাসীনতায় মায়ের ধৈর্যচ্যুতি নতুন নয়।
‘ ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে, টুয়েলভে তো অপর্ণা ম্যাডাম পড়ান। খুব বকাবকি করেন স্কুল না গেলে!’
ওঁদের কথোপকথনে অংশ নিতে ইচ্ছে করছিল না মেধার। বস্তুত বাড়ি এসে থেকে কোনো কথাই বলেনি ও প্রায়। মায়ের হাতে রেজাল্টটা তুলে দিয়ে শুতে চলে গেছিলো ওপরের ঘরে। ওর থমথমে মুখ দেখে মা-ও আর ঘাঁটাননি বিশেষ; সন্ধ্যেয় বাপি ফিরতে আলোচনা সভা বসেছে। মা ভীষণ টেনশন করেন মেধার রেজাল্ট নিয়ে, সেই ছোটবেলা থেকেই। আর বাপি একদম উল্টো। প্রতিবছর ও ফার্স্ট হলে মায়ের তরফ থেকে একটা করে লোভনীয় গিফট পেতো। বাপির কাছে চাইলে শুনতে হতো, ‘আমারটা তোলা থাক, যদি কোনোদিন রেজাল্ট ভালো না হয়, আমি সেইদিন গিফট দেবো!’ আর সত্যিই, ক্লাস এইটের অ্যানুয়াল পরীক্ষায় মাত্র কয়েক নম্বরের জন্য ফার্স্ট গার্লের গদিচ্যুত হয়ে যখন মায়ের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদছিল, বাপিই সেদিন ওকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিয়ে গিয়ে কিনে দিয়েছিলেন বেবিপিংক রঙের লেডিবার্ড সাইকেলটা। দুঃখী মুখটায় ঝলমলে হাসি নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল ওরা।
– ‘আরে বোকা, মন খারাপ করছিস কেনো? ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ সবেতেই তো কি ভালো নম্বর পেয়েছিস, টোটালে ফার্স্ট হয়েছিস, একটা বায়োলজি শুধু…’
– ‘ আহ্, কি যে বলো না! আশিতে চব্বিশ! এই নম্বর কি ওর হতে পারে!’
– ‘হ্যাঁ, সেটা বুঝতে পারছি, তুই তো বায়োলজি পরীক্ষাই সবথেকে ভালো হয়েছিল বলেছিলি!’
– ‘সেটাই তো! চার নম্বর কাটা যেতে পারে বলেছিলি, তাই না? ‘ মায়ের প্রশ্নে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে মেধা। ছোটবেলা থেকেই পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়েই ও মোটামুটি বুঝতে পারে কত নম্বর ভুল করেছে বা পারেনি। রেজাল্ট বেরোলে দেখা গেছে সে হিসেব মিলে যায় প্রায় সবক্ষেত্রেই। তাই এটা যে ওর প্রাপ্য নম্বর হতে পারে না, সেটা বলাই বাহুল্য।
বাপি ওর মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘তুই ভাবিস না অত। আসলে আমার কি মনে হয় জানিস ? উনি তোকে আদতে ভালইবাসেন, ভালো চান তোদের।’
– ‘বাসেন নয়, বাসতেন হয়তো।’ মেধার গলায় মেঘ জমা আকাশের গুমোট।
– হুম, ক্লাস টেন অব্দি তুই যখন স্কুল যেতিস নিয়মিত, তখন তোকে ক্লাসে পড়াতে বলতেন, তারপর তোর উদাহরণ দিতেন নিচু ক্লাসের মেয়েদের – মনে নেই?’
– ‘হ্যাঁ, এখনও দেন তো, কী করে একটা ভালো মেয়ে নষ্ট হয়ে গেলো তার উদাহরণ হিসেবে!’
হা হা করে হেসে উঠেছিলেন বাপি।  ‘আসলে উনি তো যত্ন নিয়ে পড়াতেন ক্লাসে, তোদেরকে তৈরি করতে চাইতেন হাতে ধরে, তাই স্কুলে না যাওয়ার আজকালকার এই রেওয়াজে কষ্ট পান সত্যিই।’
মেধা কিন্তু হাসতে পারেনি বেশ কিছুদিন। বায়োলজি বইটা আর খুলবে না, ঠিক করে নিয়েছিল। আসলে কোথায় যেন খুব গভীরে মেধাও অপর্ণা ম্যামকে ভালোবাসতো সবসময়ই। ওর প্রতি ওঁর  আস্থা হারানোটা তাই মেনে নিতে পারছিল না। ও যে নষ্ট হয়ে যায়নি, বন্ধুদেরও উপকার ছাড়া অপকার ও করতে জানে না, ও যে সেই প্রতিদিন পড়া করে ক্লাসে যাওয়া মেয়েটাই আছে, এটা প্রমাণ করতেই হতো। সেটা আর হল না! মেধা তো হেরে গেলো!

মেধা সত্যিই বায়োলজি পড়ছিল না একদম। ওর ওপর যে এতটা খারাপ প্রভাব পড়বে, ভাবতে পারেনি কেউই। নিলয় স্যার বাড়ি এসে খুব দুঃখ করছিলেন, ‘এত ভালো করে তৈরি করলি সাবজেক্টটা, তীরে এসে এভাবে তরী ডোবাস না মামণি।’ মা তো প্রায় কান্নাকাটি শুরু করেছিলেন – মেয়েটার নার্ভাস ব্রেকডাউন না হয়ে যায়! মেধার মুখে একটাই কথা, ‘বেস্ট অফ ফাইভ তো। বায়োলজি বাদ দেওয়া যাবে। আর ওই পাস মার্কস তোলার জন্য আমাকে আর পড়তে হবে না।’
এমন সময় একদিন ওদের বাড়িতে হঠাৎ এলেন যিনি, একমাত্র তিনিই বোধহয় পারতেন এই সংকট থেকে ওদের উদ্ধার করতে। হ্যাঁ, সেদিনই মেধাদের বাড়িতে প্রথম এবং আকস্মিক আগমন অপর্ণা ম্যামের। দোতলায় ওর পড়ার ঘরে এসে বসেছিলেন, জিজ্ঞেস করেছিলেন প্রস্তুতি কেমন চলছে। মেধা প্রথমে চোখ তুলে তাকাতে পারছিল না, জমে থাকা অভিমানের পাহাড় দ্রবীভূত হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিল দু’চোখ বেয়ে।  মা বলতে চেষ্টা করেছিলেন, ‘বাকি সব ঠিক আছে, শুধু বায়োলজিটা পড়ছে না একদম। টেস্টের নম্বরটা এত কম…’ মাঝপথে থামিয়ে ম্যাডাম বলেছিলেন, ‘ওসব নিয়ে ভাবার কিছু নেই। টেস্টে একটু কড়া করে খাতা দেখাই আমাদের স্কুলের রেওয়াজ।’
‘তাই বলে এত কম নম্বর? যেখানে বাকি বিষয়গুলোতে…’ মা দমবার পাত্রী নন। চোখের সামনে মেয়েটার এ অবস্থা তিনি কিছুতেই মানতে পারছেন না যে!
এবার অপর্ণা ম্যাডাম গলায় স্বভাবসিদ্ধ ঝাঁঝ এনে বলেন, ‘আপনিও স্কুলে পড়ান তো, না? কোনোদিন দেখেছেন যে ক্লাস না করলে পরীক্ষায় ভালো ফল করে কেউ?’
– ‘কী বলছেন আপনি? আমি স্কুলে পড়াই বলেই তো জানি যে এখনকার দিনে সিলেবাসের যা চাপ, তাতে ওইটুকু পরিসরে একজন টিচারের পক্ষে অতগুলো মেয়েকে সমান যত্ন নিয়ে দেখা বা উচ্চমাধ্যমিকের মত বোর্ডের পরীক্ষার জন্য তৈরি করে দেওয়া সম্ভব নয়! বেশিরভাগ ভালো ছেলেমেয়েরা বাড়িতেই তৈরি হয় পরীক্ষার জন্য। আর তাতে আমার আপনার লজ্জার বা ব্যর্থতার কিছু নেই, দোষটা সিস্টেমের, আমাদের নয়।’
অপর্ণা ম্যাম অনেকটা শান্ত, এমনকি একটু বোধহয় ভিজে গলায় বললেন, ‘মেধা, মাধ্যমিকে তো তোমাকে প্রাইভেট টিউশন পড়তে হয়নি? আমি পড়া বোঝাইনি ক্লাসে? হোমওয়র্ক দিয়ে নিয়মিত চেক করে দিইনি খাতা? একশো তে চুরানব্বই পেয়েছিলে, মনে পড়ে?’
মেধা এই পরিস্থিতির জন্য এক্কেবারে তৈরি ছিল না। কি বলবে ভেবে না পেয়ে অসহায় ভাবে তাকাতে লাগল একবার ম্যাম আর একবার মায়ের দিকে।
বাপি ম্যামের জন্য একটু জলখাবার আনতে গেছিলেন। বাড়ি ফিরতেই মায়ের উত্তপ্ত গলা পেয়ে ছুটে এসেছেন ওপরে। তিনিই সামলালেন। বললেন, ‘ নিশ্চয়! নিশ্চয়! মাধ্যমিকটা তো বাড়িতেই পড়তো ও, আমাদের কাছেই যেটুকু হয়। অদ্ভুত ব্যাপারটা হল, লাইফ সাইন্সটা ওকে আমাদের বোঝাতেই হয়নি কোনোদিন। কী যে ভীষণ প্রশংসা করত আপনার পড়ানোর! ভাল লাগানোর পাশাপাশি তৈরিও করে দিয়েছিলেন আপনি ওকে সাবজেক্টটা।’ হেসে মায়ের দিকে ফিরে বললেন, ‘এই একটু চা?’ মাও বাধ্য মেয়ের মত চলে গেলেন নিচে।
এরপর বাপির মধ্যস্থতায় ঠিক হয়েছিল, সপ্তাহে দুদিন মেধা অপর্ণা ম্যাডামের বাড়িতে যাবে। স্কুলে অনেকগুলো ক্লাস মিস করেছে, সে ঘাটতি পূরণ করতে। দু’দিন যাবার পর একটা পরীক্ষা নিয়ে ম্যাডাম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে মেধা এবার সত্যিই তৈরি হয়েছে।
উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোনোর দিনটা কোনোদিন ভুলবে না মেধা। সব বিষয়েই দারুণ নম্বরের পাশাপাশি বায়োলজিতেও আশিতে পঁচাত্তর পেয়েছে দেখে ভীষণ খুশি অপর্ণা ম্যাম তক্ষুনি মিষ্টি আনিয়ে খাইয়েছিলেন ওকে আর টিচার্স রুমের বাকি সকলকে। শিশুসুলভ একটা খুশি ঝলমল করছিল ওঁর চোখেমুখে। ঠিক এই অপর্ণা ম্যামকেই তো চিনতো মেধা! সেই যে ক্লাস টেনে সালকসংশ্লেষটা বোর্ডে গিয়ে গোটা ক্লাসকে বোঝানোর পর সবার আগে যিনি হাততালি দিয়ে উঠেছিলেন?

মাসখানেক হলো অনেক টালবাহানার পর এসএসসি-র নিয়োগ প্রক্রিয়াটা সুসম্পন্ন না হোক, অন্তত শেষ হয়েছে। মেধাতালিকার একেবারে প্রথমদিকে নাম থাকায় মেধা পছন্দ করে নিতে পেরেছে  নামকরা এই কো-এড স্কুলটা। নাহ্‌, ডাক্তারি পড়েনি ও নানান কারণে। পড়ানো ব্যাপারটা বেশ ভালো লাগে ওর, তাই কোনো অনুশোচনাও নেই তা নিয়ে। ক্লাস সেভেনে জীবন বিজ্ঞান আর ইলেভেনের জীববিদ্যা পড়াতে হবে ওকে। নতুন শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পড়ানোর মান যাচাই করা হবে মাস দুয়েক পর। ছাত্রছাত্রীরাই করবে। মেধা বরাবরই নিজের কাজটা বেশ নিষ্ঠা নিয়ে করে। রীতিমত পড়াশোনা করে নোট বানিয়ে নিয়ে আসে ক্লাসে। মাঝে মাঝে একটা করে পরীক্ষা নেবে ঠিক করেছে, বাড়তি ক্লাস হিসেবে – দেখা যাক! গত সপ্তাহ থেকে ক্লাস ইলেভেনের সেশন শুরু হয়েছে। এই ক্লাসটা নিয়েই ওর আগ্রহ বেশি। একটু উঁচু ক্লাস হলে তবেই  সাবজেক্টের গভীরে ঢোকা যায়, পড়িয়ে আনন্দ আর শান্তিও তাই বেশি।
মেধা ক্লাস টিচার নয় ইলেভেনের। কিন্তু আজ ওদের প্রথম ক্লাসটা হয়নি। তাই রোল কল করার খাতাটা খুঁজে নিয়ে আসতে মিনিট পাঁচেক দেরি হয়ে গেল। ইস্, শেষ করতে পারবে তো আজকে চ্যাপ্টারটা? দ্রুত পা চালালো দোতলার উদ্দেশে।
‘রোল নম্বর ওয়ান..
রোল নম্বর টু..
রোল থ্রি… ‘
কি আশ্চর্য! প্রথম দশ জনের মধ্যে সাত জন নেই! রজতাভদাও শর্মিলাদিকে সেদিন বলছিলেন টিচার্স রুমে  ‘প্রতিদিন ক্লাসে গিয়ে নতুন নতুন মুখ দেখছি। পড়া ধরবো কি, না পারলেই বলছে আমি আগের দিন আসিনি স্যার, জানতাম না বা বুঝিনি। এরা নাকি আবার ইভ্যালুয়েট করবে আমাদের! কি অবস্থা বলতো!’ ওঁরা দুজনও মেধার সাথেই যোগ দিয়েছেন এই স্কুলে। মেধা অবশ্য ইভ্যালুয়েশনের ব্যাপারে চিন্তা করেনি, কিন্তু ওর কপালেও ভাঁজ পড়ল আরো মাসখানেক পর। ছুটির পর আধঘণ্টার একটা পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। বিষয়টা অনুমোদনও করিয়ে রেখেছিল ও প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে। কিন্তু  প্রশ্নপত্রের পঞ্চাশটা কপির মধ্যে বত্রিশটাই যে রয়ে গেলো ওর হাতে!
.
মাস তিনেক আগে একদিন স্টেশন বাজারে বহুদিন পর হঠাতই দেখা হয়ে গিয়েছিল অপর্ণা ম্যামের সাথে। অবসর নিয়েছেন সম্প্রতি। চোখের পাশে ঘন হয়ে এসেছে বলিরেখা, গলার স্বরেও সেই দাপট উধাও। কুশল বিনিময়ের শেষে সস্নেহে বলেছিলেন,  ‘বাড়িতে এসো একদিন।’ ঘাড় নাড়লেও যাওয়া হয়ে ওঠেনি মেধার। আজ একবার যাবে। যাবেই।

লেখক পরিচিতি :  অমৃতা চক্রবর্তী
১৯৯২ সালে শহর কলকাতা থেকে ৭০ কিমি দূরে নদিয়া জেলার রানাঘাটে জন্ম। যাদবপুর বিশ্ববদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে চেন্নাইতে আইআইটি মাদ্রাস-এ গবেষণারত। সাহিত্যে, বিশেষত বাংলা সাহিত্যে ঝোঁক ছোট্টবেলা থেকেই। আধুনিক লেখকদের মধ্যে স্মরণজিৎ চক্রবর্তী, শ্রীজাত, সায়ন্তনি পুততুণ্ড, চন্দ্রিল ভট্টাচার্য প্রিয়। নিজে লেখালেখিতে এক্কেবারে নভিস, কিন্তু আগ্রহী। কর্তব্য আর আনন্দের ভারসাম্য রেখে এগিয়ে চলাই জীবনের মন্ত্র।

1 thought on “একটি বৃত্তের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *