লীনা ভট্টাচার্য

সকল বাড়ির হলুদ দেওয়ালে কত টুকরো ছবি। কেউ সময়ের ধুলোয় ঢাকা, কেউ হাতে গরম তাজা। “প্রাণের পরে চলে গেল কে বসন্তের বাতাসটুকুর মতো” – ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলা – কখনো থেমে-দৌড়ে-এক ছুটে বকুলতলায়-ছোট্ট ছোট্ট বকুল বিছানো পথ পেরিয়ে পেয়ারা আর বাতাবি ফুলের যৌথ সম্ভাষণ সব কিছু – হ্যাঁ সবকিছু পেরিয়ে…

“আন্টি আসবো?” – চিকন গলার ডাক।

সামনে অবিশ্রান্ত কৈশোর আবার ডাকে, “আন্টি একটু শুনুন।”

কাজ ফেলে দিদিমণি বেশ তিক্ত।

– “কী ব্যাপার? সাত সকালে কী সমস্যা?”

– “না একটু আসবেন বাইরে? একটু কথা আছে।”

– “কী কথা? এখানেই বলো।”

স্টাফ রুমে ঢুকতে চায় না কালো কিশোরী…

“না না মানে, একটু আলাদা করে…” থমকায়….

– “দ্যাখ্‌, তোর সাথে পার্সোনাল কথা আছে রে, আমাদের সামনে হবে না। যা না বাবা উঠে দ্যাখ্‌ – তোর তো ফ্যান ফলোয়ার দিন দিন বাড়ছে…” হেসে গড়িয়ে পড়লো অন্য এক দিদিমণি, ঈষৎ ট্যারা চোখের আড় চাহনি কেটে বসলো নতুন দিদিমণির গায়ে, আমল দিল না।

সত্যিই ও ভেবে পায় না, কেন, কেন ও ওদের মতো হতে পারে না। তাহলে তো কোনো কথাই হতো না, শুনতে হতো না টিকাটিপ্পনী।

– “জাস্ট পারা যায় না”, বললো মুখে। “উৎপাত যতো” – এটা বলতে বলতে চেয়ার ছাড়লো দিদিমণি। মনের কোণে ট্যারা চোখের বাণ সিঁদ কাটছে তখনও।

শীর্ণ শ্যামলা মেয়ে এক চোখ ভয় নিয়ে দাঁড়িয়ে স্টাফ রুমের সামনে। অসহ্য মাথা গরম হয়ে গেল নতুন দিদিমণির। গলা চড়িয়ে বলল, “কী চাই? যত্তোসব ঝামেলা, বাড়িতে কী হয়েছে? কী চাও?”

শ্যামলী বলে না কিছু। শুধু মাথা নাড়ে এদিক ওদিক।

বোঝা যায় না। আবার ধমক – “কী হয়েছে, বলো?”

নিরুত্তর কন্যা। আর একটু সিঁটিয়ে দাঁড়ায়, হাত দিয়ে বুকের ওপর জামার ফ্রিলটাকে আবার জায়গায় বসিয়ে দেয়, স্কার্ট ধরে টেনে নামায়।

কিশোরী দেহের সবে ফুটে ওঠা ছোট্ট স্তন ঢাকা পড়ে ফ্রিলের আড়ালে। পায়ের জঙ্ঘায় ঘাসজমির মতো নরম চিকণ লোম খাড়া হয়ে ওঠে স্কার্টের ঘষায়। মর্মান্তিক এক করুণ আর্তি নিয়ে দীঘল কালো চোখ… বলে ওঠে, “আমি কি খারাপ আন্টি?”

বিদ্যুৎ চমক খেলে যায় দিদিমণির শিরদাঁড়ায়। বয়স মেরেকেটে ১৪। ক্লাস এইটের অ্যানুয়াল পরীক্ষায় ফেল না করলে নাইনে পড়তো। নাম…না,নামটা থাক। ও একটা নাম পাবে এই গল্পের শেষে।

– “কেন কী হয়েছে? কে বলেছে? বলো আমায়। ক্লাসের মেয়েরা? কোন মেয়ে? নাকি বাড়ির লোক?” দিদিমণির হাজারো প্রশ্নে থতমত কৈশোর।

জড়সড় হয়ে আমতা আমতা উত্তর, “আন্টি বলেছে”।

– “মানে? কোন আন্টি?” – বলেই দিদিমণি বুঝতে পারে অসম যুদ্ধের ঘোষণা হয়ে গেল!সব্বোনাশ। তাই একটু সামলে নিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে স্টাফরুমের নাগালের বাইরে এসে দাঁড়ায়।

– “বলো কে বলেছে? নিশ্চয়ই কিছু বদমাইশি করেছ? আর কত?”

মেয়েটি বরাবরের দুষ্টু – অতিরিক্ত চঞ্চল – প্রতি পিরিয়ডে জল খাওয়া, টয়লেট যাওয়ার নাম করে ক্লাস কাটার ছল। স্কার্টের ঝুল ছোট, ফ্রিলের ওপরের বোতাম খোলা। ব্রণচর্চিত মুখ। বখাটে ভাষা – ‘কেয়ার করি না’ প্যাটার্নের মেয়ের সে ভাষা বড্ড অচেনা দিদিমণির।

– “আমি মরে যাব। দেখবেন তখন আর আপনাদের ভুগতে হবে না; স্কুলের সব মেয়েরা আমার থেকে ভালো।”

একরাশ অভিমান।

দিদিমণি হতভম্ব – আস্তে হাত রাখে তার মাথায় – ছিটকে সরে যায় কিশোরী।

– “কী হলো?”

– “আমি পচা আলু আন্টি। ভালো আলুদের সাথে রাখলে সেগুলোও নষ্ট হয়ে যাবে। তাই…”

– “মানে?”

– “কোন মানে নেই। এটাই বলেছেন – হ্যাঁ হ্যাঁ এমনটাই বলেছেন ওই আন্টি।” কথাটা প্রচণ্ড ঝাঁজাতে ঝাঁজাতে দাঁতে দাঁত চিপে কিড়মিড় করে ফিসফিস করে বলে ও।

– “না না এভাবে হয়তো উনি বলতে চাননি। তাছাড়া সত্যিই তো তুমি কোন কথাই শোন না। আন্টির আর দোষ কি!” বলছে দিদিমণি, কিন্তু ভেতরে কেউ যেন বলছে, না এভাবে বলা যায় না। কিন্তু সকলের চৌহদ্দিতে তো কেউ তা প্রমাণ করতে পারবে না…

অলিখিত অদৃশ্য অমানবিক কথোপকথন হতেই থাকে। কিছু কানে আসে। অধিকাংশই আসে না। এলেই বা কি? তাকে নস্যাৎ করার ক্ষমতা কারই বা আছে? দিদিমণির তো নয়ই। এক্ষুণি দু’জন সহকর্মী ওর পাশ দিয়ে চলে যাবার সময় মন্তব্য করে, “আবার?” মানে রোজই তো বড়ো দিদিমণির ঘরের দরজায় দেখা যায়, তাই আজ আবার? কিন্তু এখানে কেন?

গম্ভীর গলায় দিদিমণি বলে -“ক্লাসে গিয়ে বসো”।

– “না”

– “কেন?”

– “আমাকে ওই ঘরটায় সারাদিন বসতে বলা হয়েছে। বাবাকে ডাকা হয়েছে। এলে নিয়ে যাবে।গিয়ে আবার মারবে।” – নির্লিপ্তভাবে বলে মেয়েটি।

– “বাবা মারবে কেন?”

– “কেন আবার?” রোজই তো বলে, কোন মুরোদ নেই, রোজগারের কালো কুচ্ছিত মেয়ে কেউ নেবে না…” একটু যেন অন্যমনস্কতা মাটিতে দাগ কাটে। মনে হয় সেই দাগ দিদিমণির মনের ভিতরেও পড়ছে।

– “আমি কী করতে পারি বলো?”

– “না না আন্টি কিছু করতে হবে না, কেন জানিনা মনে হলো আপনাকে বলি।”

– “ও আচ্ছা”

– “ঠিক আছে আন্টি। যাই আমি। ওখানে গিয়ে বসি।”

আর কোন কথা বলেনি দিদিমণি। দৃপ্ত পায়ে স্টাফরুম আর অফিস ঘরের মধ্যবর্তী ঘাসজমিটা পেরিয়ে কিশোরী গিয়ে বসেছিল অফিস ঘরে। টিফিনের বেল পড়লো। উচ্ছ্বল কৈশোর ঝাঁপিয়ে মাড়িয়ে দুমড়ে দিয়ে চললো ক্যান্টিন। ওই মেয়েটি ওখানে বসে। উৎসুক চোখের উঁকিঝুঁকি!

– “উফফ। ওই অসভ্য নোংরা মেয়েটা, দেখ দেখ আবার কেস খেয়েছে।”

দিদিমণি আর কিছু দেখে না। বলে না। বোঝায় না। কারণ সদ্য পাশ করে তার নতুন চাকরি পাওয়া। তার কাছে কেন কোনো মেয়ে তার ব্যক্তিগত খারাপ লাগা জানাবে, এই প্রশ্নবাণে গোটা স্টাফরুম মুখর।

কেটে যায় দিন। অন্যান্য দিনের মতো ছুটি হয়। তার আগে কোনো একটা সময় মেয়েটির অভিভাবক এসে নিয়ে যায় মেয়েটিকে। দিদিমণি বাড়ি ফিরে আসে। পরিবারের কাজের চাপ, ছোট্ট বাচ্চার দেখাশোনায় ডুবে যায় কিশোরীর আর্তি।

পরের দিন, যথারীতি স্কুলে যায় দিদিমণি। হাজিরা খাতায় সই করে। স্টাফরুমে যায়। একটু অন্যরকম ঠেকে চারদিক, তিন-চার জন দিদিমণি এদিক ওদিক জটলা করছে। প্রেয়ারের বেল বাজে। শিক্ষিকারা হলে জড়ো হয়, হেডমিস্ট্রেস প্রেয়ারের পর ঘোষণা করেন, আমাদের স্কুলের ক্লাস এইটের ছাত্রীর মৃত্যুর খবর। সাধারণ মৃত্যু নয় – সে তার জীবন শেষ করে দিয়েছে। দড়ির সাথে চিরবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে। উদ্ধার হয় মৃত্যুকালীন লিখিত জবানবন্দি, তাতে লেখা “আমি খুব খারাপ। তাই আর থাকলাম না, চললাম। আর বাবাকে কোনোদিনই আমার স্কুলে অপমানিত হতে যেতে হবে না। পচা আলু হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে জিতে যাব আমি – এটাই আমার বাঁচা।” শিক্ষিকা কিশোরীর বাড়ি যায় অন্যদের এড়িয়ে। বাবা নির্লিপ্ত। কিশোরীর চলে যাওয়া না যাওয়াতে খুব বেশি কোন পার্থক্য চোখে পড়ে না। কিশোরীর এক বান্ধব ছিল জানা যায়। ইস্কুল থেকে ফেরার পর চোখে কাজল ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে জিন্স‌ টপে কিশোরী অপেক্ষা করেছিল সেই বান্ধবের জন্য। ফোন করে জানতে পারে, তার মতো নোংরা মেয়ের সাথে ঘুরতে ওই বান্ধবের ঘেন্না হয়। আর সময় দেয়নি নিজেকে। একবুক অভিমান বাষ্প হয়ে ওঠার আগেই দড়িতে আশ্রয় নেয় সে।

‘জয়ী’ তার নাম।

হতবাক সেই শিক্ষিকা আজও নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না। উপদেশবাণী দেওয়া সেই শিক্ষিকা পরে অনেক সম্মাননা পায় – বহু সংস্থার তরফে – ‘আদর্শ শিক্ষিকা’-র তকমা তার গলায় ঝোলে। এখনো সে প্রতিটা দিন অফিসঘরে গিয়ে খুঁজে আসে কোনো অবহেলিত কৈশোর বসে আছে কিনা। তার চাকরির কাল এখনো সুদীর্ঘ। তাই সে জোর করেই এগুলো করে। এখনো ব্যঙ্গবিদ্রূপ তাকে তাড়া করে বেড়ায়। যদি তখনই মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারতো – “না রে, তুই খারাপ কেন হবি? খারাপ তো আমরা। যারা প্রতিদিন হেরে হেরে বেঁচে আছি, বাঁচার অভিনয় করছি।”

সেদিনের সেই না-বলা কথার রুদ্ধস্বর আছড়ে পড়ে জয়ীর পায়ে গায়ে – আদর মাখায়।

লেখক পরিচিতি : লীনা ভট্টাচার্য

লীনা ভট্টাচার্য পেশাগতভাবে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। লেখালেখি, গান, সামাজিক কাজকর্মে যুক্ত।পারিবারিক নানা ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যেও সুন্দর সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখে চোখ।

1 thought on “জয়ী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *