সিদ্ধার্থ বসু ( জন্ম ১৯৮০); স্কুল শিক্ষক। মূলত কবিতা লেখার দিকে ঝোঁক আছে। এছাড়াও অন্যান্য লেখালেখির চেষ্টাও করে থাকেন।


ইতিহাস

পুলিশের তূণে থাকে টিয়ার গ্যাস, পুলিশী অভেদ বর্ম লাঠি
পাব্লিক অস্থির হলে মৃদুমন্দ, শাসক নাড়েন কলকাঠি
বিচলিত জনতার মাথা ফেটে ফিনকি দেয় লাল
পিঠ কেটে, উরু কেটে বসে যায় প্রশ্রয়ের দাগ
বাতাসে খবর ওড়ে, ভাইবন্ধু, সামাল সামাল
ফুলের মতন যুদ্ধ, ভেসে যায় রক্তাভ পরাগ
অমান্য করেছি যাকে, তার হাতে আছে হাতিয়ার
যাকে অবিশ্বাস করি, কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছি তার
সুপ্রাচীন এ লড়াই চিরায়ত অপরিণামের
নবান্নের রঙ লাগে যশোর রোড-সিংগুর-ভাঙড়-নন্দীগ্রামে

*

পাহাড়ে

১.
চালিয়েছি আনকা গুলি
পড়েছে দু-তিনটে লাশ
তা বলে কি জঙ্গী হবে?
গণতন্ত্রই তো, সাবাস

২.
বরফে টাটকা রক্ত দাগ রেখে যায়
স্বদেশ মিছিলে চলে ছিন্ন হাতে-পায়

৩.
আমি তোমাকে খুবলে খাব, তুমি আমার কামড়ে নেবে টুঁটি
নেই আমাদের নুন-ভাত-জল-রুটি

৪.
ফিরে এসো, অস্থির হোয়ো না
গণতন্ত্রে অন্ধকূপ আজও খালি আছে
তোমাদেরই কথা ভেবে দু-চারটে নাছোড় বুলেট,
বেফায়দা বিপথগামী হয়ে পড় পাছে

৫.
আমাদের দেশ, আমার পাহাড়, আমাদের চা-বাগান
গুলির আওয়াজে মিশে যায় ওই আমার পাখির গান

*

কলেজ স্ট্রীট

১.
বন্ধ কথা, বন্ধ স্লোগান তোলা
মুখ বেঁধে সব মানুষরা হরবোলা

২.
কোথায় মিছিল? নেই কি অবরোধ?
ধন্দে পুলিশ, দ্বন্দ্বে কানুন-বোধ।

৩.
হুল্লাট কই? নিয়ম তুলে খিস্তি?
কাপড় ঢাকা নাদান চোপা। বিশ্রী!

৪.
বাড়ছে গাড়ি, আসছে লাঠি, ঢাল
বেচাল হলে খিঁচেই নেবে খাল
পঙক্তি বেঁধে নীরব ভোটার, ঠায়
ঘিরছে পুলিশ, তিক্ত, নিরুপায়

৫.
তখন বেগে ছুটিল ঝাঁকে ঝাঁক
যষ্টি কাঁধে কয়েক শত সান্ত্রী
ডরাতে এসে নিজেরা হতবাক
মৌন ঘৃণা! এ কি রে বিভ্রান্তি!

৬.
বন্ধ মিছিল, বন্ধ কলরব
এখন শুধুই শান্তিকল্যাণ
ধার্য করুন শব্দবিহীন স্তব
আমরা তাই-ই, যা আপনি চাইলেন

৭.
মন্ত্রী এলেন মর্ত্যে, মজুত পাইক ও বরকন্দাজ
জোনটি নীরব, সামলে লেডিজ, বড়দা এবং ভায়রা
হুকুমমাফিক মিটিং মিছিল বেবাক এবে বন্ধ
নাচার পুলিশ, দিচ্ছে বাওয়াল টিএমসিপির পায়রা

৮.
ভেবেছ ঝাঁকের কই মিশে যাবে ঝাঁকে
কে জানে কলির ফেরে কে মারে কে রাখে?
হৃদয়ে হৃদয় যোগ হলে বিপর্যয়
মানুষে মানুষে মেশা সেহেতু নিকেশ
ক্রমশ ঘনিয়ে এল ক্রান্তির সময়
এ রাস্তা আমারো রাস্তা, আমাদেরই দেশ

*

উচ্ছেদ

১.
খুবলে নাও,উপড়ে ফেলো
মানুষ তবু বাঁচে,
ঘরের আড়াল গুঁড়িয়ে দিচ্ছ
খোলা আকাশ আছে—
এক আকাশের ছই-এর নীচে
কেউ নয় আর একা
জোট বাঁধছে,পেয়েছে যত
সবহারানোর দেখা|

২.
কাড়ছ যাদের ভিটে-মাটি
নতুন শহর গড়বে বলে
তারাই রুখে দাঁড়ালো ওই
শেষের লড়াই লড়ার দলে।

৩.
থাকার বলতে বালাই শরীর
গুঁড়িয়ে গেছে ঘর
ছায়ার মতন হচ্ছে জড়ো
সঙ্গী পরস্পর

৪.
ওরাও তোদের দেশের মানুষ,
তোদের ঘরেই বাস—
নিজেই চিতায় নিজেই আগুন
জ্বালিয়ে দিতে চাস?

৫.
আমাদের হাত-পা ছিল
খিদে, রোগ, তেষ্টা ও শীত
রোদে পুড়ি, বৃষ্টি ভিজি—
আমাদের এই তো অতীত
আজো সব তেমনি আছে
এ পোড়া বর্তমানে
তবে কেন ছাড়ব মাটি?
ভয় পাব, কী তার মানে?

৬.
কার ঘরে জ্বলেনি দীপ? পাওয়ার গ্রিড
রোদ-জলে কাহিল লোক? মোটর কার
জোত-জমি সরকারী, ন্যায্য ডিড
তাও যারা গররাজি, সর্হদ পার

৭.
বাইরে থেকে লোক জুটেছে ‘বহিরাগত’ নামে
তারাই এসে খেপাচ্ছে লোক, ছুঁড়ছে গুলি-শেল
পুলিশ নেহাত নাদান, দ্যাখো কি ঘটে আঞ্জামে
শাসক ধোয়া তুলসীপত্র, জমে উঠেছে খেল
এমনই ঠিক তকমা ছিল সিঙুর-নন্দীগ্রামে
ইতিহাসের পরিহাসের বাকিটা গসপেল

৮.
চলে যদি একটাও বুলেট
সকলের বুকে বেঁধে গুলি
খোঁচালে একটাও বেয়নেট
প্রতিরোধে লক্ষ চোখ তুলি
সমবেত ফেরাই নজর
হে শাসক তোমার ওপর
ক্ষমা নেই তোমার হে বাবু
হে রেজ্জাক, ওহে আরাবুল
যেই থাক পর্দার ওপাশে
আমাদের কী বা যায় আসে?
যে মাটিতে দু-পা রাখি, আমার
যে বাতাসে শ্বাস নিই, তা-ও
যে হাতে মেলাচ্ছি হাত, আমার
লোভে মাখা মুঠোটা সরাও

৯.
বসে আছে সিপিএম, প্রতিরোধ-মিছিলে নামবে
আম আদমি বসে আছে, খুনোখুনি কবে যে থামবে
সিএম এর চামচারা বসে নেই, নেমেছে প্রচারে
আকাশ বাতাস কাঁপছে সাজানো কথার দামামায়
সাজানো বাগান সব ক্রমশই যাচ্ছে ছারেখারে
আমআদমি দিন গুনছে, বসে বসে, চিরধুলোপায়
আসলে বামফ্রন্টও জানত কাদের দালালি করছে তারা
সমস্ত টিএমসি জানে কার গুলিতে মারা গেছে কারা
গুলিয়ে দেওয়াই লক্ষ্য শাসকের: গাড়ি-তেল-সার
অতঃপর উন্নয়ন…বিদ্যুতের অবশ্য দরকার
আমআদমি বসে আছে, বেসাহারা, হাতে গুঁজে মুঠো
দ্রিমিকি দ্রিমিকি বাজছে দুপায়ের নিচে তপ্ত মাটি
ক্রমে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে ভেল্কি সব, মায়াঞ্জন, ঝুটো
এবারে টলবে যত ধান্দাবাজি-শয়তানির ঘাঁটি

ছবি – স্বর্ণ জানা

2 thoughts on “সিদ্ধার্থ বসুর কবিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *