ঊর্মিমালা ব্যানার্জি‌

 

ভগবানের নির্দেশ বরাবরের মতো এবারও রাতারাতিই এল। দৈববাণী হল, “যাও বাড়ি চলে যাও, কাল থেকে বাড়ির বাইরে বেরনো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।” বেসরকারি চাকরি, ট্রেনিং-এ “আজ্ঞে হ্যাঁ” বলাটাই সবথেকে জোর দিয়ে শিখিয়েছিল, কাজেই অভ্যস্ত মন বললো, একটু হুমকির মতো শুনতে লাগছে ঠিকই , কিন্তু ওপরওয়ালারা বলছে যখন নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তেই বলছে। দুটো খটকা ছিল বটে, এক হলো তাহলে কাল থেকে অফিস যাবার কী হবে? অফিস অবশ্য তক্ষুনি বলে দিল, ‘বাড়ী থেকে কাজ করো’, কারণ কর্মচারীদের জীবন নাকি তাদের কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। শুনে প্রথমেই ভক্তিতে বুকটা ভারি ঠেকল। তারপরেই মনে হল, কাল থেকে খাব কি? সুতরাং যথেচ্ছ চাল-ডাল-মাংস-দুধ-ওষুধপত্র ইত্যাদি কিনে বাড়ি বোঝাই হল। পকেট-পেট সামলে নিয়ে লক্ষ্মী ছেলেমেয়ের মতো ল্যাজ গুটিয়ে যে যার গর্তে সেঁধিয়ে গেলাম।

‘করোনা রাক্ষুসী আসবে, পালাও পালাও”, শ্রীমতি ব্যাঙ্গা দেবীর গলা পেয়ে বারান্দায় যাই। সকালের দিকটায় ব্যাঙ্গা দেবী আমজনতাকে দর্শন দেন ও তাদের কল্যাণার্থে কিছু মূল্যবান উপদেশ দিয়ে থাকেন। সেদিন ব্যাঙ্গার লক্ষ্য রামহরি, অর্থাৎ যিনি আমাদের কমপ্লেক্সে ময়লা ফেলেন আর যে ছেলেটি কাগজ বিলি করে। ব্যাঙ্গা তাদের বলছে, “করোনা রাক্ষুসী আসবে, তোমরা শিগগিরই বাড়ি চলে যাও, মুখ ঢেকে নাও মুখ ঢেকে নাও, তাড়াতাড়ি করো। আচ্ছা, বিপদ হলে আমায় ডেকো, কেমন? ডাকবে তো?“  এদিকে ব্যাঙ্গার অনলাইন ক্লাসের সময় হয়ে গেছে। তার মা বহুবার ডেকেও কোনো ফল না পেয়ে, এবার এসে অসহযোগী ব্যাঙ্গাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে যান। ভিতরে চলে যেতে যেতেও ব্যাঙ্গা চিৎকার করে বারবার ওদের মনে করিয়ে দিতে থাকে, “ডেকো কিন্তু, ডাকবে তো?” “ডাকবে তো?” কথাটির ওপর যেন একটু বেশি জোর। যদি ডাকে, তাহলে হয়তো সে একটু বেরোতে পারে, কতদিন হয়ে গেল ব্যাঙ্গা রাস্তায় হাঁটেনি, মাঠে ছুটোছুটি করেনি, দোলনা দোলেনি, ঢেঁকি চড়েনি প্রাণ খুলে।

কাগজের ছেলেটি এই দৃশ্য দেখতে দেখতে পাশের বারান্দায় আমায় দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করে, “দিদি, তোমরা আর কাগজ নেবে না?” কী জানি, ক’টা বাড়ি কাগজ দেয়, মাথাপিছু সেই হিসেবে হয়তো তার আয় নির্ভর করে। ওদিকে ‘কী কী থেকে এই রোগ ছড়াতে পারে’ সেবিষয়ে ‘হোয়াটসঅ্যাপ-ইউনিভার্সিটি’র বিধান মোতাবেক খবরের কাগজও বিপজ্জনক। সত্যি মিথ্যা জানি না, আর যাচাই করবো এত সময় কোথায়? তাই নিরুপায় হয়ে উত্তরটা এড়িয়ে বলি, “আচ্ছা, তুমি ক্লাস নাইনে পড়তে না? তোমাদের স্কুলটুল হচ্ছে?” তার শুকনো মুখ আরো শুকনো দেখায় যেন, বলে “হুঁঃ, আর স্কুল!” অর্থাৎ হচ্ছে না, আর হবেও না। মানে কিনা ও এবং ওর মতো আরো অনেকেরও যে এই সময়ে স্কুলের প্রয়োজন ছিল, এবিষয়টা নিয়ে দেশের ও দশের অভিভাবকেরা কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। দৈববাণী এসম্পর্কে নীরব। যেন ওদের না পড়লেও চলবে।  

শেষ যেদিন বাজার সেরে ফিরছিলাম, প্রায় সদর দরজার কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, অমনি ছপ করে কোত্থেকে যেন এক চলকা জল মাথায় এসে পড়ল। ওপরে তাকিয়ে দেখি, একতলার বারান্দায় মেলে দেওয়া বেডকভারের পিছন থেকে একটি ছোট্ট মাথা উঁকি দিচ্ছে, বললাম “ব্যাঙ্গা তুমি কি আমায় চান করাচ্ছিলে?” ব্যাঙ্গা এবার ভরসা পেয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, “না না তোমায় না, রাস্তায় ওই পিঁপড়েটা যাচ্ছে না, ও জল খেতে চাইছিল তো, তাই।” ও বুঝেছি, তাই ব্যাঙ্গা রান্নাঘর থেকে বোতলে রাখা অ্যাকোয়াগার্ডের জল এনে পিঁপড়েদের একটু বিতরণ করছিল। আহা! এমন মহান প্রাণ ক’জনের থাকে? কিন্তু মা-মাসি তো দেখতে পেলেই চেঁচামেচি করবে। তাই বেচারা ব্যাঙ্গাকে চুপিচুপি এসব সেরে ফেলতে হয়। তারপর কাজ মিটে গেলে যে যাই বলুক সে আর মাথা ঘামায় না। আমার ঘামে ভেজা মুখটা দেখে বুঝি তার দয়া হয়, বলে “তুমি হাঁ করো, তোমাকেও জল দিই।” ওই দশ ফুট ওপর থেকে জল খাবো! তাড়াতাড়ি বলি, “না না আমার তেমন তেষ্টা পায়নি। তুমি বরং পিঁপড়েদেরই খাওয়াও। আমি আসি।”

এদিকে ‘বাড়ি থেকে কাজ’ মানে দাঁড়ায়, বাড়িটাই অফিস। ম্যানেজার বলল, “আরে বাবা ছুটি নিয়ে কী করবে, সেই বাড়িতেই তো বসে থাকবে, তার চেয়ে বরং…” সুতরাং হৈরৈ করে কাজ এগোচ্ছে, যত এগোচ্ছে তত আরো বেশি কাজ আসছে। দিন নেই, রাত নেই, নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, শনি নেই, রবি নেই, সবই সমান। চব্বিশ ঘন্টা কম্পিউটারে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা। আর কী দুর্ধর্ষ নজরদারি! কে কতক্ষন সীটে নেই, কম্পিউটার সব জানিয়ে দিচ্ছে, অমনি মোবাইলে ফোন আসছে, “আচ্ছা, কোথায় আপনি? সব ঠিকঠাক আছে তো? তাহলে…?” অফিস যা গুরুত্ব দিচ্ছে, নিজেকে এতো গুরুত্বপূর্ণ কোনোদিন মনে হয়নি! কিন্তু কেন জানি বিষয়টা তত উপভোগ করতে পারছি না।  

সেদিন সন্ধ্যেবেলা সবে একটা মিটিং-এর পর কান থেকে হেডফোনটা নামিয়েছি, এমনসময় উল্টোদিকের ফ্ল্যাট থেকে এক মহিলার আর্তনাদ, “তোর পায়ে পড়ি বাবা, ওরে পড়তে বস, দয়া কর, ওরে কাল অনলাইন টেস্ট রয়েছে।” তারপর ক্রমশ সেই গলাই শুনি গর্জনের আকার নিচ্ছে, “কী রে! বসলি পড়তে? আমি গেলে কিন্তু কেউ এসে রক্ষা করতে পারবে না?” সর্বনাশ! বুক দুরদুর করে। কী জানি বাবা! এত গায়ে গায়ে সব ফ্ল্যাট, কী জানি ভুল করে যদি সেই গলাধারিণী আমার দরজা দিয়েই ঢুকে আসেন! একটু পরেই শুনতে পাই, বল্টুর নির্ভীক গলা, “আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি, আমি ধূমকেতু জ্বালা, বিষধর কালফণী…” এক মিনিট সব চুপচাপ। ভাবছি কী হল রে বাবা তারপর সেই মহিলা কণ্ঠ অন্য কারুর ওপর আছড়ে পড়ল, “তুমিই যত নষ্টের গোড়া, কতদিন বলেছি ওর সামনে…” একটা গোবেচারা ঢ্যাঁড়স খাওয়া গলা বলতে চেষ্টা করে “…মানে, আমি ভাবলাম যে এসব কবিতা শুনলে বাংলার ভিতটা পাকা হবে তাই…” “চুলোয় যাক ভিত, ক্লাসের পরীক্ষায় ডিগবাজি খেলে কি তোমার রবীন্দ্র-নজরুল এসে বাঁচাবে?” ঢ্যাঁড়স এরপর কী বলে বা আদৌ কিছু বলতে পারে কিনা শোনা যায় না। আমি দাঁড়ে বসে বসে ভাবি, “হুঁহুঁ বাবা! অনলাইন ক্লাস হলে রবি ঠাকুরও স্কুল পালিয়ে বাঁচতে পেতেন না।” ব্যাঙ্গা, টুকাই, বল্টু, তোড়া সবাই ওরা অনলাইন ক্লাস করছে। বেচারারা প্রায় চব্বিশ ঘন্টা কম্পিউটারে বা মোবাইলে মুখ গুঁজে বসে থাকে। তার মধ্যে দু’চারজন প্রতিবাদী যা একটু আশার আলো দেখায়। যেমন ব্যাঙ্গা – তাকে কম্পিউটারের সামনে চেপে বসিয়ে রাখলে সে চিলচিৎকার করতে থাকে, “চ্যানেল চেঞ্জ করো! চ্যানেল চেঞ্জ করো!” আর ক্লাস শুরু হলেই টুকাইয়ের খালি হাসি পায়, “এ বাবা! ম্যাম তোমার মুখটা ওরকম লম্বা হয়ে গেলো কি করে! ম্যাম…?” দু’জনকেই অবশ্য ম্যাম ক্লাসে মিউট করে রাখেন। আসলে অনলাইন ক্লাসের এই একটা সুবিধে, ইচ্ছে করলেই বোতাম টিপে শ্রোতাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া যায়। কিন্তু বাচ্চারা তো আর জন্মেই আমাদের বড়দের মতো মুখ বুজে থাকতে শেখেনি, তাই তাদের কাছে এ এক অসহ্য অবস্থা। মিস কিছু শুনতে পাচ্ছে না, খালি মিস যা বলছে তাই তাদের শুনতে হচ্ছে! এর প্রতিবাদে ব্যাঙ্গা প্রথমে চেয়ারে আধশোয়া হয়ে থাকে, তারপরে ঠ্যাংদু’টো কম্পিউটারের সামনে তুলে ধরে, তখন মিস তার ভিডিওটাও অফ করতে বাধ্য হন। আসলে বিদ্রোহ খুব ছোঁয়াচে তো, নাহলে মুহূর্তের মধ্যে বাকি একপালের ভিতরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সমান ফালতু অবস্থা ব্যাঙ্গার দিদি তোড়ারও। ধুৎ! ক্লাসে যদি বন্ধুরা মিলে গল্পই না করা যায়, সেটা একটা ক্লাস হলো নাকি! তারপর ফস করে তাদেরই এক বন্ধু ভুলবশত একদিন মিসকে ‘রিপোর্ট স্প্যাম’ ক্লিক করে বসে, ব্যাস! একেবারে মেঘ না চাইতে জল! মিসবিহীন ক্লাস আর চুটিয়ে আড্ডা। কেউই বোঝেনি মিস কেন ক্লাসে ঢুকতে পারছে না। যাহোক যতদিন না স্কুল আবার নতুন ব্যবস্থা খুঁজে পেয়েছে, ততদিন মন্দ কাটেনি। অগত্যা দুষ্টুমিও টুকটাক বাঁচার পথ খুঁজে নিচ্ছে অনলাইনেই।

রাতারাতি চারপাশের চেনা পরিবেশটা কেমন বদলে গেল। রাস্তায় মুখঢাকা দু’চারটে লোক মাঝেসাঝে একা একা ব্যস্তসমস্ত হয়ে হেঁটে চলে যায়। গাড়ি বলতে মাঝেমাঝে অ্যাম্বুলেন্স কিম্বা পুলিশের জিপ। মাঝেমাঝে শববাহী কাঁচের গাড়ি। বারান্দায় দাঁড়ালে কেমন গা ছমছম করে।

অতএব মন বলে “করোনা রাক্ষুসী আসবে, পালাও পালাও, ঘরের মধ্যে পালিয়ে যাও।” ঘরের ভিতর কম্পিউটারের-ফোনের নরম নীল আলো ডাকছে, টেনে নিচ্ছে, আদর করে। আহ! আর তত ভয় করছে না।  চিন্তাগুলো মুছে মাথাটা হালকা লাগছে। ধীরে ধীরে আমরা সবাই বাতাসে ভাসছি। কিন্তু একি! সবাই আমরা ভেসে ভেসে কেমন ঢুকে যাচ্ছি এক একটা ব্ল্যাকহোলের মধ্যে। বাঁচাও! বাঁচাও! কেউ শুনতে পাচ্ছে না কেন। আরো জোরে চেঁচাই। তবু কেউ শুনতে পাচ্ছে না, আসলে সবার কানেই তো হেডফোন। তারপর দুম করে মাথাটা টেবিলে ঠুকে যাওয়ায় ঘুমটা ভেঙে গেল। উফ! কী ভয়ানক স্বপ্ন রে বাবা! ফোনটা তুলে দেখি বসের মিস কল। শালা, বাড়িতে গোপন ক্যামেরা বসিয়েছে কিনা একেকসময় সন্দেহ হয়। ফোন করতে বললেন, “অতনুদাকে আর রাখা গেল না, এতো সময় নেন একটা কাজ করতে, অনেকবার সাবধান করেছিলাম ভদ্রলোককে। সময় খারাপ বুঝতেই পারছেন। এমনিতেই কোম্পানির অনেক ক্ষতি হচ্ছে। আগামী মাস থেকে ওনার দায়িত্বটা কিন্তু আপনাকেই বুঝে নিতে হবে। আপনার মতো দক্ষ লোকই আমাদের কোম্পানির সম্পদ।” অর্থাৎ আমাকেও সাবধান করা হলো।   

আমাদের আবাসনের সামনের ওই বড়রাস্তা, তার ওপারে ওই যে খালটা, যেখান থেকে সন্ধের দিকে দুর্গন্ধ আসে বলে ওদিককার ফ্ল্যাটের সব জানলা বন্ধ রাখতে হয়, সেই খালটার ওধারে রত্নাদের বস্তি। রত্না আমাদের বাড়িতে রান্না করতো।  ইদানীং তো ছোঁয়াচের ভয়ে ওদের এই আবাসনে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, গেটে কড়া পাহারা, ভাবটা যেন ওই মানুষগুলোই ভাইরাস!

ওদের বস্তির সবাই প্রায় কাজ হারিয়েছে। আমি প্রতিমাসে ওদিকে একবার যাই, রত্নার মাইনেটা দিয়ে আসি। সে কাঁদে, নিতে চায় না। আসলে সে তো আর ভিখারি না। দান তো তার কাছে অসহ্য হবেই, কিন্তু পেটের খিদের কাছে সব তেজ বোধহয় হার মানে। রত্না বলে, “দিদি তুমি খুব ভালো তাই এখনো মাইনে দিচ্ছ, আর কেউ তো…” আমি বলি, “না, আমিও আসলে অন্যদের মতোই রে রত্না। আজ আমি মাইনে পাচ্ছি, তাই তোমায় দিতে পারছি। আর কোম্পানিও আমায় এমনি এমনি মাইনে দিচ্ছে না, ওয়ার্ক ফ্রম হোমের নামে ৮ ঘন্টার জায়গায় ১৬ ঘন্টা খাটিয়ে নিয়েই দিচ্ছে। কাল যদি আমিও মাইনে না পাই, তাহলে তখন কি পারব তোমার পাশে দাঁড়াতে? যখন আমার নিজের ভাঁড়ারে টান পড়বে তখন পারব তো?”   

এদিকে আলো নিবিয়ে টর্চ জ্বালিয়ে ভগবানের ঢ্যাঁড়া পেটানোর পর এলো গোমূত্র পানের বিধান। সেই অনুপ্রেরণায় কিনা জানি না, কিন্তু প্রায় ওই সময়েই আমাদের বল্টু প্রতিদিন দুপুরে দাদুর গামছাটা কমোডের জলে ভিজিয়ে নিয়ে সব ঘরের মেঝেগুলো মুছে রাখছিল। কিন্তু গোপূজারীদের মূত্রপ্ল্যানের মতো তার প্ল্যানটাও ধোপে টিকলো না। যে মা-দাম্মার জন্য এত পরিশ্রম, সেই তাদের হাতেই এমন হেনস্থা পেতে হয়েছে বেচারাকে, যে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অগত্যা এখন সেও খালি টিভিতে কার্টুন দেখছে আর অনলাইন ক্লাস করছে। কিন্তু সব সত্ত্বেও আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকল, বেড়েই চলল। মায় রামদেববাবাজির করোনীলকেও করোনা কোনো করুণা করল না। তবু শুনি উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের সুতপা বৌদি তাঁর কেয়ারি করা শৌখিন ফুলের বাগানে জল দিতে দিতে আশ্বাস দিলেন, “এই জানো, চিন্তার কিছু নেই, অমিতাভ ভালোই আছেন, খবরে বলছে সকালে একটু পাঁউরুটি খেয়েছেন, রাতে জুস খাবেন।” হা হতোস্মি! পাশের বারান্দা থেকে ঘোষদা বললেন, “দেখো তোমাকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করেছি, করোনা প্যাকেজ, ন্যূনতম তিন হাজার টাকা থেকে দশ হাজার, কুড়ি হাজার নানান রকম। নিশ্চিত সেবা, ভিডিও ডাক্তার পরিষেবা, ডাকলেই অ্যাম্বুলেন্স, থাকাখাওয়া স্টার হোটেলের মতো।” হ্যাবলার মতো প্রশ্ন করি, “কিন্তু ওষুধ? তা তো দিচ্ছে না নিশ্চয়ই, কারণ এর তো কোনো ওষুধই নেই, তাহলে কি শ্মশান খরচটাও ধরা আছে?” সুতপা বৌদি বলেন, “যাহোক পয়সা ফেললে অন্তত এটুকু তো পাওয়া যাচ্ছে। এবাজারে এই বা কম কী, বলো?” আরে ছি ছি! কম কি বলছি! বেশিই তো! পয়সা দিচ্ছেন বলে কথা! সবার কি সে কপাল থাকে? কিন্তু জানেন কী? ওদিকে বুক চিতিয়ে কেউ মাইনে কমাবে না বলে আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও আড়ালে আবডালে সব কোম্পানিই কিন্তু যে যার ইচ্ছে মতো মাইনে কমাচ্ছে, নোটিশ দিচ্ছে, লোক তাড়াচ্ছে। বালাই ষাট , একটু খোঁজ রাখবেন, হয়তো আপনাকে না জানিয়ে আপনার মেয়ে, ছেলে, বা স্বামীও ইতিমধ্যেই দিন গুনছেন। তবু যতদিন পয়সা আছে দিয়ে যান, তারপর না হয় ভাববেন। কাজেই আপাতত দাদাবৌদিরা চোখ বুজে বংশ বিস্তার করে বেঁচে থাকুন। সেই আদি অকৃত্রিম ভরসার গাঁজায় দম দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন, যে কেউ নিশ্চয়ই আছে, যে সব পাপের প্রতিকার করবে। এর মতো আরাম আর আছে নাকি? হার্টের ওপর চাপ পড়ে না, রক্তে শর্করার মাত্রাও স্বাভাবিক থাকে। দেশের অভিভাবকরাও খুশি হয়। এত সুবোধ দেশবাসী! ট্যাও করে না, ম্যাও-ও করে না। সরকারি ভাঁওতার তেল দেওয়া বাঁশে উঠতে বললে ওঠে, নামতে বললে নামে। যদিও ক্রমশ নুনছাল উঠে গায়ে হাতপায়ে জ্বালা ধরতে শুরু করেছে, মনটা মাঝেমাঝে কু গাইছে, তবে কি সত্যিই কেউ নেই? কেউ থাকলে হয়তো এসব দিন দেখতে হত না! অথচ মুশকিল হল, বাঁশটাকে ঘুরিয়ে যে লাঠিও বানানো যায়, সেটা কিছুতেই মাথায় আসছে না।

তা আসবে কী করে? অভিভাবকরা বুদ্ধি করে আগেই সেটাকে স্কুলের সিলেবাস থেকে বাদ দিয়েছেন যে। সুতরাং খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল। বরং অভিভাবকরা একটু ঠান্ডা মাথায় নিজেদের শোষণ থুড়ি শাসনটা একটু গুছিয়ে নিচ্ছেন, দু’চারটে আইন-টাইন একটু আধটু সংশোধন, তেলের দামটা একটু বাড়িয়ে নেওয়া। আহা, বেচারা আম্বানির দু’বিলিয়ন ক্ষতি হচ্ছে, কি কষ্ট বলুন তো! সরকারের একটা দায়িত্ব আছে তো? না কি!

রত্নার ছেলে গণেশের মুখটা মনে পড়ে। শেষবার আমি যখন গেছি, তখন সে ফুটপাথে মুখ গোঁজ করে বসে। রত্না বলে “দেখ না, বোকার মতো বায়না ধরেছে, স্কুলে যাবে। কত বলছি যে স্কুল এখন বন্ধ!” আমি একটা চকলেট দিতে তার সেই ফোকলা দাঁতের এক গাল হাসিটাও মনে পড়ে। কিন্তু আমিও তো কেবল চকলেট দিয়েই দায় সেরেছি, বলতে পারিনি, “তোর বাচ্চাদের আমার কাছে রেখে যাস রত্না।” কাগজ বিলি করা ছেলেটিকে ডেকে বলতে পারিনি, “আয়, তুইও অনলাইন ক্লাস করবি।” চব্বিশ ঘন্টা অনলাইন ঘানি টানার পর পকেট আর পেটের বাইরে বাকি অনুভূতিগুলো এমনিতেও নেতিয়েই থাকে, তবু মনে হয়, ওদের ইচ্ছেটা বড্ড অন্যায্য কি? মনে হয়, ডিজিটাল ইন্ডিয়া আসলে একটা ভাঁওতা। শাইনিং ইন্ডিয়াটা বুঝি শুধু আম্বানি-আদানিদের জন্যই শাইন করে, রত্নার ছেলে কিংবা জামলো মাকদমদের কাছে স্রেফ জ্বলন্ত চুল্লি!

এমাসে গিয়ে শুনে এলাম, হাসপাতাল সংলগ্ন রত্নাদের বস্তিতে দাবানলের মতো ছড়াচ্ছে রোগ। সোশ্যাল ডিস্ট্য়ান্সিং, বারবার হাত ধোয়ার কথাগুলো মুখে এসে গেছিল। ঠিক তখনই ওই ঘিঞ্জি ঘরগুলো থেকে একটা হাত বেরিয়ে এসে যেন আমার মুখে সপাটে চড় কষাল। বাইপাসের ধারে সারি করে থাকে উঁচু উঁচু হাইরাইজ বিল্ডিং, আধখানা তৈরি ট্রাম্প টাওয়ার, কবে কোন শাহরুখ খান কুড়ি কোটি টাকা দিয়ে কিনে কুড়ি মিনিট থাকবেন সেই অপেক্ষায়। অথচ এই দুঃসময়ে সেগুলো কেউ খুলে দেয় না এই বস্তিবাসীদের জন্য, ব্যবস্থা করে না দু’বেলা দু’মুঠো খেতে দেবার! ওই খাল দিয়ে বয়ে যায় গোটা অঞ্চলের আবর্জনা। হাসপাতালের অনেক পরিষ্কার কর্মীরা ওই বস্তিতে থাকেন, হয়তো তাঁদের থেকেই সংক্রমণ বাড়ছে দ্রুত। যাবতীয় বিষ গিলে ওই বস্তি যেন নীলকণ্ঠ মহাদেব। কিন্তু হাসপাতালে কাজ করলেও, বা হাসপাতালের গা ঘেঁষে গড়ে উঠলেও, ওই হাসপাতাল তো আর ওদের চিকিৎসার জন্য নয়। ওখানে চিকিৎসা করতে যারা আসে, তারাই এখনো ভাবতে পারেন, যে কেউ নিশ্চয়ই আছে যে সব সমস্যার প্রতিকার করবে। বস্তিবাসীর জন্য বরাদ্দ শুধু সরকারি হাসপাতালে ধর্না আর বিনা চিকিৎসার প্যাকেজ।

হঠাৎ আমার ঘরে বসে দেশোদ্ধারের অলস ভাবনা ভেঙে দিয়ে ফোনটা বেজে ওঠে। রত্নার গলা, “দিদি গো সর্বনাশ হয়ে গেল! বাঁচাতে পারলাম না! চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেলো গো! ছেলেটাকে কোথাও ভর্তি নিল না! এখন কী হবে গো…” রত্নার ছেলের মুখটা মনে পড়ে, ফোকলা দাঁতের এক গাল হাসিটা মনে পড়ে। আমি বলতে চাই, “ধরণী দ্বিধা হও”, বলতে চাই, “রত্না আমিও বেঁচে নেই রে, আমি আসলে আগাগোড়া মানুষের ভেক ধরে আছি, চোখ থেকেও দেখি না, কান থেকেও শুনি না, বাতেলা দেওয়া ব্যতিরেকে কিচ্ছুটি করি না…” বলতে চাই, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না। কিছুক্ষণ বুকচাপড়ে কেঁদে, শেষে রত্নাই সান্ত্বনা দেয়, “কেউ নেই গো দিদি, আসলে কেউ কোত্থাও নেই।“ গেল বছর ডেঙ্গুতে রত্না বরকে হারিয়েছে। রত্নারাই জানে, যে আসলে কেউ নেই, আছে শুধু সে নিজে আর তার মতো ঘরে আগুন লাগা আরো অনেকে।   

রত্নার ফোনটা রাখতে রাখতেই পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম চুল্লিটাকে। চুল্লির আগুনটাকে, যা এখন রত্নাকে পোড়াচ্ছে, পোড়াচ্ছে রাস্তার ওপারে ওদের বস্তিটাকে, একটার পর একটা ঝুপড়িকে। তবে রাস্তা পেরোতে আগুনের বেশি সময় লাগে না। ওই আগুন এপারেও লাগবে। খুব শিগগিরই। আগুনের হাত থেকে কেউ রক্ষা পাব না। আর অস্বস্তি থাকবে না রে রত্না,  তখন সব খুইয়ে রাস্তার এপার-ওপার সবাই দাঁড়াব একসাথে, সবার পাশে সবাই। মানুষের একমাত্র যথার্থ অবলম্বন।

ঊর্মিমালা লেখালেখি করেন ইতস্তত এলোমেলো ভাবে।

 

সঙ্গের ছবি – ইন্টারনেট থেকে

1 thought on “শাইন ইন্ডিয়া, শাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *