জিনিয়া ব্যানার্জ্জী অধিকারী

(১)

ভোর চারটে। একটা আবছা আওয়াজ ভেসে আসছে যেন –

 ‘শুক বলে ওঠো সারি ঘুমাইওনা আ-আ-আর….. এ জীবন গেলে ফিরে পাবে না আবা-আ-আর…’

‘এ বাবা!  চারটে বেজে গেল! ইস বড় খোকা আজ কলকাতা থেকে আসবে! টহলদারের গলাটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। কার্তিক মাস পেরিয়ে গেলেও লোকটার বিরাম নেই। যতদিন না জাঁকিয়ে শীত পড়ছে চলবে। ….আজ আগেই উঠতে হত।’ ভেবে অন্যদিনের তুলনায় দ্বিগুণ তাড়াহুড়োতে কাজে মন দিল সাধনা। কাপড় ছেড়ে গ্যাসে চায়ের জল চাপিয়ে দিল। তারপর প্রাতকৃত্য সেরে, চা খেয়ে আটা মাখল।

‘বড়খোকা পরোটা খুব ভালোবাসে। আলুভাজা আর নলেন গুড় দিয়ে যখন দেব তখন মুখখানা হবে দেখার মতো’- ভাবতে ভাবতে মুখ টিপে হাসল সাধনা। গুনগুন করতে করতে পরোটা আলুভাজার যোগাড়ে মন দিল। এলে গরম গরম করে দেবে। ওই কাকটা আবার এসে বসেছে কার্নিশে। সারাদিন জ্বালায়। তবু সাধনার ভালো লাগে। খুব ছোট বয়সে ওরা যখন বিকেলবেলা খেলা সেরে বাড়ি ফিরত তখন নদীর পারে স্যালো-ঘরটার ছাদে একদল কাকের জটলা চলত। ওরা তখন খুব হাসাহাসি করত আর বলত, ‘ওই দ্যাখ কাকেদের মিটিং চইলসে।’ একটু হাসি ঠোঁটের কোণে ঝিলিক দিল। বাসি রুটি একটা ছুঁড়ে  দিল সাধনা। আবার চায়ের জল চাপাল। ভোলার মাকে আজ তাড়াতাড়ি আসতে বলেছে। তার আবার দুটো বাসি রুটি আর একগ্লাস চা চাই। তাই জলটা এবার বেশী করে দিল। সাইকেলের বেল বাজতেই একখানা ফর্দ আর একটা থলে নিয়ে এগিয়ে গেল। বাগান পেরিয়ে পেল্লাই লোহার গেট। দুটো তালা দেওয়া থাকে সবসময়। চাবির গোছা সাধনার শাড়ির আঁচলে বাঁধা। শাশুড়িমা যখন মৃত্যুশয্যায়, অশীতিপর কাঁপা হাতে এই আজীবন আগলে রাখা পরম যত্নের ধনখানি তার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘সামলে রেখো।’  

সাধনা বিজনবাবুর হাতে থলেটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘আজ একটু তাড়াতাড়ি লাগবে কিন্তু…’ সে জানে, বিজনবাবুর ফিরতে রোজ এগারোটা। তবু এটা বলা ওর অভ্যাস। আজকে যা রান্না হবে তার বাজার অবশ্য গত কালকেই করিয়ে নিয়েছে। 

বিজনবাবু তাদের বাজার-হাট করে দেয়। পুরোনো লোক। শাশুড়ির আমল থেকেই এই কাজ করে আসছে। ব্যবসার কাজে ছেলের ব্যস্ততার বহর দেখে শাশুড়িমাই বিজনবাবুকে ডেকে এই কাজের দায়িত্ব দেন। তখন ভরা সংসার। শাশুড়ির সুগারের ব্যামো, কর্তার হার্টের রোগ, তাদের আলাদা মেনু। ঝি-চাকর-দোকানের দুটো কর্মচারী- ড্রাইভার এতগুলো মানুষের পাত পড়ত রোজ। তার উপর ছোটছেলেটা ছিল আদুরে।  বেলা করে উঠত। তারপর তার দাবি ছিল স্পেশাল জলখাবার। কোনদিন চাওমিন, কোনদিন লুচি, কোনদিন চিড়ের পোলাও। বড়টার ছিল কলেজের ভাত সঙ্গে টিফিন। এতকিছু সকাল দশটার মধ্যে বানাতে হতো সাধনাকে। তাই সময় মতো বাজার না এলে সেটা সম্ভব ছিল না। 

বিজনবাবু বাজারটা করেন খুব গুছিয়ে। এক্কেবারে টাটকা সব্জি তো বটেই, তাছাড়া কোন সব্জি কিনলে তার সঙ্গে কোন উপাদানের সঙ্গত লাগবে এ বিষয়েও খুব অভিজ্ঞ। যেমন মোচার সঙ্গে সাইজ অনুপাতে ছোট্ট একটি নারকেল কিংবা লাউয়ের সঙ্গে একশো গ্রাম কুচোচিংড়ি। ভালো কাঁচকলা পেলে তার সঙ্গে গুছিয়ে সুক্তোর যোগাড়, আবার ব্যাগের উপর বাঁধাকপি উঁকি মারছে মানেই ব্যাগের তলায় মটরশুঁটি আছেই আছে।

সাধনার খুব ভোরবেলা ওঠার অভ্যেসটাও তখন থেকেই। তারপর আছে গোপালকে জল দেওয়া। নিত্যপুজোর তাড়াহুড়ো। নিয়ম করে প্রতিদিন তিনবার গোপালকে জল বাতাসা দেয় সাধনা। এই গোপালের কাছে কত মানত করে, কত ভোগ দিয়ে বিয়ের সাতবছর পর কোলে এসেছিল বড়খোকা তার তিনবছর পর ছোটখোকা। সেই যে গানের দল আসতো জন্মাষ্টমীর পরের দিন –

‘আনন্দ হল বড় আনন্দ হল / নন্দের নন্দন হয়েছে দেখে আসি চলো / এল বড়াইবুড়ি হাতে রাঙা লড়ি / নাচিতে না পারে বুড়ি দেয় হামাগুড়ি / মনের আনন্দে রে…. / নাচিতে না পারে বুড়ি দেয় হামাগুড়ি…’  

ওই গানের দলের আগে আগে ধুলোয় গড়াগড়ি খেয়েছে ছয়বছর। তবেই না ওরা কোল আলো করে এসেছে!

(২)

সেই বীভৎস দিনগুলোর জন্যেই নিজের অতীত ঘাঁটাতে ভালো লাগেনা সাধনার। তবু এক একটা দিন আসে, যখন মনের অতলে থাকা স্মৃতিগুলো আপনাআপনি ভেসে ওঠে। এই প্রাসাদোপম বাড়িতে তারা স্বামী-স্ত্রী, শ্বশুর-শাশুড়ি ছাড়া কাজের লোক আর ব্যবসার লোকজনের যাতায়াতে এ বাড়ি গমগম করত। তবু একটা বিরাট অভাববোধ সবার মধ্যে জেগে উঠছিল। প্রথম প্রথম আড়ালে আবডালে, পরে সামনাসামনিই সবাই তাকে এটা ওটা জিজ্ঞেস করে বসত। কারণে অকারণে আত্মীয়-স্বজন সকলেরই ওই এক কৌতুহল। প্রথমদিকে যদিও স্বামী কিছু বলতনা, কিন্তু ধীরে ধীরে তার মধ্যেও একটা বিরক্তি জন্ম নিল। নানা অছিলায় সে বিরক্তি ফুটে বেরোত তার ব্যবহারে।

সাধনা বুদ্ধিমতী। উপেক্ষা, করুণা, তাচ্ছিল্য এসবের কোনওটাই এই প্রথম দেখছে না সে। বাগবিতণ্ডা তার স্বভাব বিরূদ্ধ। বিয়ের আগে অতগুলো বছর মামার বাড়িতে কাটাতে গিয়ে এসবের সঙ্গে তার খুব জানাশোনা। দূরত্ব যতই বাড়তে লাগল, সাধনাও তার সমস্ত সত্ত্বাটাকে মুড়ে ফেলল একটা কঠিন আবরণে যেখান থেকে কেউ যেন তার মনের নাগাল না পায়। রামায়নের জটায়ু চরিত্র তার খুব প্রিয়। ডানা কাটা যাক, গড়গড়িয়ে ঝরুক রক্ত, কিন্তু মেরুদন্ডের ঋজুতা যেন অটুট থাকে। আত্মসম্মানবোধ অটুট রাখতে চুপ থাকাই শ্রেয়, এ অভিজ্ঞতা তো জীবন থেকেই পাওয়া! সে কী খেতে ভালোবাসে, কোনটা পছন্দ কোনটা অপছন্দ, কোনটায় সম্মত বা অসম্মত এসব কিছুই তার আপনজনদের গোচরে এল না আর কোনদিন। অবশ্য আপনজন বলতে কী বোঝায় ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই যারা আপন ভিটে-মাটি থেকে উৎখাত হয়ে যায়, তাদের আর নতুন করে কেউ আপন করে নিল, কি না নিল, কিস্যু আসে যায় না। নির্বিকার থাকতে থাকতে সংসারের খুঁটিনাটি জিনিসের সঙ্গে গড়ে উঠল সখ্যতা। নুন তেলের কৌটো সাজানো, বড়ি দেওয়া, আসন বোনা আর সকলের প্রয়োজনমতো নিজেকে সহজলভ্য করে তুলতে এতটাই যত্নবান হয়ে পড়েছিল যে যাবতীয় চাওয়া-পাওয়া, বাপেরবাড়ির সাথে যোগাযোগ সবই আস্তে আস্তে কমে গেল। তার নিজের মধ্যেও যেন একটা শূন্যতা গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠছিল দিন। তখনই বার-ব্রত-উপবাসের মধ্যেই আশ্রয় বা সমাধান খুঁজেছে। দিনগত পাপক্ষয় করতে করতে দুই ছেলের জন্ম। আর তারপর পাকাপাকিভাবে বহির্জগতের সঙ্গে বিচ্ছেদ। অথচ যখন স্কুলে পড়ত তখন কিন্তু পরিচিত মহলে মিশুকে বলেই জানত তাকে সবাই। খুব ভালো রবীন্দ্রসংগীত গাইত সাধনা। বিশেষতঃ ওই গানটা যখন গাইত তখন তার গায়ে কাঁটা দিত,

‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া / বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।’

স্কুলে প্রার্থনায় সকলের সামনে দাঁড়িয়ে দরদী গলায় গাইত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ তার সুরে সুর মিলিয়ে বাকী সবাই একসঙ্গে গেয়ে উঠত। মাঝে মাঝে হাসান মাষ্টারের অনুরোধে ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়’ গাইতে হতো। হাসান মাষ্টার কিরকম অনুরোধের সুরে বলতেন, ‘ওইটা একবার গাইবি রে মা?’ সাধনা গাইত। তবে তার নিজের পছন্দ ছিল রবি ঠাকুরের গান। গানটা নাতনিকে শিখিয়েছে। ভিডিওকল করলেই সাধনা ওই গানটা শুনতে চায়।

বড়খোকার একটি ছেলে। যন্ত্রের কল্যাণে তার সঙ্গে সাধনার খুব জমে। কথা বলা শুরু হলেই তার নানান রকম খাবারের আব্দার। সাধনা করেও রাখে এটা-ওটা, বড়খোকা এলে তার হাতে দু’ব্যাগ ভর্তি করে পাঠিয়ে দেয়। নাতিটা চিঁড়ের পোলাও খেতেও খুব  ভালোবাসে। এক্কেবারে তার ছোটকা’র মতো। কিন্তু  কাছে পায় কই যে করে খাওয়াবে!  সাধনার মনে পড়ে সেই সকালগুলো। থালায় চিঁড়ে বাছতে বাছতে ডাক দিত, ‘ছোটবাবু ওঠো…  খাবার হল বলে…’

শাশুড়িমা থাকতেই ওর জন্ম। খেতে দিতে দেরি হলে সাধনার কপালে জুটত গুচ্ছের তিরস্কার । তখন থেকেই অভ্যাস খাবার চাপিয়ে ছেলেকে ডাকা। বিশেষ করে ছোটবাবুকে। ওর বাবা তো ছেলের মুখটাও দেখে যেতে পারে নি। ডেলিভারির আগের রাতে বুকে ব্যাথা নিয়ে ভর্তি হল হাসপাতালে। সাধনা সঙ্গে যেতে পারেনি। যন্ত্রণাকাতর মুখটার দিকে চেয়ে আনত মস্তকে সারা রাতের অপেক্ষা… পেটে লাথির জোর বাড়তে বাড়তে শেষে স্থির। তারপর এমন চাপ বাড়ল যে আর তাকে ঘরে রাখা যায় নি। বিকেল নাগাদ সব শেষ। সেই রাতের যন্ত্রণাকাতর স্মৃতিটুকু তার আজন্মকালের সঙ্গী হয়ে রয়ে গেল। নিঃশ্বাসের সঙ্গে  শিরায় শিরায় সে অনুভুতি আজও টের পায় চোখ বন্ধ করলেই।  ঠিক যেমন এই মুহূর্তে। মনের মধ্যে টুকরো টুকরো ঘটনার কোলাজ চোখ ছাপিয়ে মনটাকে কাজে বসতে দিচ্ছে না।

বড়টার এসবের বালাই ছিল না। সে যা পেত তাই খেত। তবে মায়ের মন তো, মুখ দেখলেই সাধনা বুঝতে পারত পছন্দ-অপছন্দ দুটোই।

(৩)

পাশের বাড়িতেও আজ সবাই তাড়াতাড়ি উঠেছে। ওদের ছোটছেলের বিয়ে। আজ বৌভাত। মাইকে গান  বাজছে সকাল থেকে। এ পাশের বাড়িতে  সকাল সকাল স্বামী-স্ত্রীতে বচসা বেঁধেছে। সারাটা দিন দু’জনে কাজে বেরোয়, বাড়ি তালা বন্ধ থাকে।  যেটুকু সময় একসঙ্গে থাকে ঝগড়াঝাটি আর মারপিট লেগেই থাকে।

অনেক কাজ! একে একে সেরে না ফেললে দেরী হয়ে যাবে। তার মাঝে আবার ওদের ঝামেলা! মনটা খুঁত খুঁত করে উঠল সাধনার। স্বামীর সঙ্গে ঝগড়ারত রাখীর জন্যে ওর মনোযোগের ঘাটতি হচ্ছে। মেয়েটা বড় ভালো। বয়স কম। চার বাড়ি কাজ করে আর রাতে এক বৃদ্ধাকে আগলায়। রাত ন’টা থেকে সকাল আটটা সেখানে থাকে। তাই নিয়ে ওর স্বামী ওকে সন্দেহ করে। লোকটা ভ্যান চালায়, রোজগারপাতি কম। রাতে নেশা করে, সেই খরচ চালাতে রোজ বউয়ের কাছে হাত পাতে। না দিলেই মারধর করে।  এ পাড়ায় সবাই ওকে খারাপ মেয়ে বলেই জানে। সাধনা ছাড়া কেউ কথা বলে না। সাধনাও আগে বলত না কিন্তু মেয়েটাকে দেখলেই ওর বড় আপন বলে মনে হয়। যার বাড়িতেই কাজের লোক ছেড়ে যায় সেই  রাখীকে তলব দেয়। দু’দিন চালিয়ে দেবার জন্য। রাখীও রাজী হয়ে যায়। এই ভদ্র, অভিজাত পাড়ায় থাকতে গেলে এইটুকুনি তোষামোদ  তো করতেই হবে। তা না হলে কেউ ভালোবাসবে না যে। পিছনে যাই বলুক উপকার পেলে পাড়া-ছাড়া করার কথা অন্তত কেউ ভাববে না। রাখীর যখন পাঁচ বছর মতো বয়স হবে, তখন ওর মায়ের সঙ্গে ওই বাড়িটায় এসেছিল। রাখীর মায়ের উপর ও বাড়ির কর্তা-গিন্নীর দেখভাল করার দায়িত্ব দিয়ে ছেলেরা নিশ্চিন্তে বাইরে থাকত। মাত্র দুইমাসের ব্যবধানে বৃদ্ধ-বৃদ্ধার আকস্মিক মৃত্যুর পরও রাখীর মা ওই বাড়িতে থাকত। বছর চারেক আগে রাখীর মাও গত হয়েছে। তখন থেকে রাখীরা আছে। তবে প্রোমোটারের আনাগোনা লেগেই থাকে। রাখী জানে যে কোন দিন বাড়িটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। তার মধ্যেই গতরে খেটে যেটুকু জমানো যায়! একটা মাথা গোঁজার আস্তানা অন্তত না করতে পারলে পথে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। খুব পরিশ্রমী আর পরোপকারী রাখী। যে যখন ডাকে ছুটে যাওয়া ছাড়াও মনিবের গাছের নারকেল, বাতাবি, পুঁইশাক, কামরাঙা এসব হলেই আজ এবাড়ি তো কাল ওবাড়ি দিয়ে বেড়ায়। তবু তার গায়ে ‘খারাপ মেয়ে’র তকমা বলে প্রকাশ্যে সবাই এড়িয়ে চলে। একমাত্র সাধনাই ব্যতিক্রম।

বাড়ির কাজের পাশাপাশি সাধনার অনেকখানি সময় কাটে বাগানে। তিনতলা বাড়িটার সামনের দিকে অনেকখানি অংশ জুড়ে বাগান। বাগানের বাইরে গোল বাউন্ডারি-ওয়াল। বাগান ভর্তি ফল-ফুল গাছ।  তবে মাঝে একখানা টগর ফুলের গাছ আছে। ওখান থেকে রোজ সাজি ভরে ফুল তোলে সাধনা। ওদেশে ওদের বাড়ির উঠানে ধানের গোলার ঠিক পাশে, পাঁচিলের গা ঘেঁষে একটা সাদা কাঠটগরের গাছ ছিল। সেই গাছটার নীচে ছিল সাধনা আর সাবিনার পুতুলের সংসার। ওই কাকটা, আর এই টগরের গাছটা যেন সাধনার বড় আপন।  যে বছর সাধনা কানাডায় গিয়েছিল ছোটছেলের কাছে, পুরানো টগরগাছটা যেন অভিমানেই শুকিয়ে গেছিল। সেবার রাখীই একটা টগরের ডাল দিয়েছিল।

মেয়েটার প্রতি তার এই মায়ার একটা গূঢ় কারণ আছে। বহুবছর আগের কথা। সাধনার বয়স তখন সাত কি আট। মা-বাবা আর ঠাকুমার সঙ্গে ওরা দুইবোন নিজেদের দেশ ছেড়ে, বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল ওরা। সেদিন মাঝরাতে গ্রাম ছেড়ে পালানোর সময় খুব ইচ্ছে করছিল সাবিনার সঙ্গে একটিবার দেখা করে আসবে। কিন্তু পরিস্থিতি তা হতে দেয় নি। আর কখনও দেখাই হল না সাবিনাকে।

এবাড়িতে বিয়ে হয়ে আসার পর ছাদ থেকে যেদিন প্রথম রাখীকে দেখেছিল বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠেছিল। এ কাকে দেখছে সাধনা? এত মিল হয়, দুটো মানুষের মধ্যে! সেই থেকে কারণে অকারণে রাখীকে সারাদিনে একটিবার দেখার জন্য ছটফট করত মনটা। ছোট্ট রাখী ওর মায়ের সঙ্গে এ বাড়িতে এলে সাধনার মন ভরে যেত।

(৪)

তখন রাখীর বয়স সাবিনাকে ছেড়ে আসার বয়সের মতোই। তবুও চট করে তাকে কাছে টানতে পারে নি সাধনা। আভিজাত্যের বর্ম চট করে ফেলে দিতে পারে নি। আবার শিকড়ের টানের মতো টানকে অস্বীকারও করতে পারে নি। এখন অবশ্য আভিজাত্যের ভার নেই। সে স্বাধীন। তবুও গম্ভীর ব্যক্তিত্বশালিনী সাধনার অনুভূতি সরাসরি রাখীর সামনে প্রকাশিত হয় না।  

সাধনা অনুভব করে তার আশৈশবের সখ্যতার রঙ, কৈশর-যৌবন-প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে এই বার্ধ্যক্যে এসে একটুও ফিকে হয়নি। মনের গোপন কুঠুরিতে সযত্নে রাখা আছে আজও। সময় সুযোগ পেলেই রামধনু হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। হয়ত সেই কারণেই পাড়ার আর পাঁচ জনের মতো রাখীকে সে অপছন্দ করতে পারে না। বরং মনে মনে ওরই পক্ষ নেয়। এত পরিশ্রম করে সংসারটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, অথচ ওর গায়েই খারাপ মেয়ের তকমা! লোকটা তো ভয়ানক অসভ্য। যেমন বেলাগাম মুখের কথাবার্তা, তেমনি চালচলন। তাকে তো কেউ খারাপ লোক বলে না! বরং সবাই বলে ‘বেটাছেলে ওরম একটু-আধটু বাউন্ডুলে হয়, তাই বলে মেয়েমানুষের বেলেল্লাপনা কি কেউ সহ্য করতে পারে?” সাবিনার বাবাও খানিকটা রাখীর বরের মতো ছিল। সে দেশের মানুষও সালিশি-সভা ডেকে মহাসমারোহে সমগ্র দিক বিবেচনা করে সাবিনার মাকেই দোষারোপ করত। দেশকালের গন্ডী পেরিয়ে বিচারের নামে যে প্রহসন জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সাধনা দেখেছে, তাতে এত সহজে কোনও মেয়েকে সে দোষী ঠাউরাতে পারে না। এই সব সাতপাঁচ ভেবেই সে একদিন সাধনাকে ডেকেছিল। প্রয়োজনহীন কথাও বলেছিল কিছু।

তারপর একবার বর্ষায় কুয়োতলায় পড়ে গিয়েছিল সাধনা। তখন রাখী তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে গিয়েছিল হাসপাতালে। তিনমাস ডান পায়ে ব্যান্ডেজ। ভোলার মা, বিজনবাবু আর রাখী তিনজনের উপকার জীবন থাকতে ভোলার নয়।

‘নাঃ কী যে হল আজ! এত ভাবনা ভাবলে সব দেরী হয়ে যাবে। ভাগ্যিস শাশুড়ি বেঁচে নেই, নাহলে আজ কপালে কষ্ট ছিল। বাবা! কত দিন ধরে কত কষ্ট, কত খোঁটা আর জ্বালাযন্ত্রনা ভোগ করতে হয়েছে, সর্বংসহা হয়ে। তবে ছেলেদুটো মানুষ হয়েছে।’ আজ সে এক গরবিনী মা! গর্বের কথা ভেবেও  একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। রাখীর সঙ্গে বেশি কথা বললেই তার স্বামী-শাশুড়ির মতো ছেলেদেরও মানে লাগে।

বড়ছেলে কলকাতায় উচ্চপদস্থ অফিসার। ছোটছেলে থাকে কানাডায়। প্রত্যেক সপ্তাহে নিয়ম করে মায়ের সাথে ভিডিও কল্ এ কথা বলে। মাকে নিয়ে গিয়েছিল বছরখানেকের জন্যে মেয়ের জন্মের পর। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করে। বছরখানেক মায়ের তত্বাবধানে মেয়েকে রেখে, তারপর ক্রেশে দিয়ে দু’জনে  বেড়িয়ে পড়ত। নাতনির এখন বছর চারেক বয়স হবে। সে অবশ্য ঠাকুমাকে  নামমাত্র চেনে। এদিকে আসতে গেলে নানান হ্যাপা, তাই নাতনির জন্য মন কেমন করলেও বলতে পারে না। জেনেশুনে কে আর নিজের ছেলেকে ঝামেলায় ফেলতে চায়! ছেলেরা মাকে টাকা পাঠাবার কথা বললেও সাধনা নিতে চায় না। ওই দোকান থেকে যেটুকু হয় তাতেই খেয়ে পরে বাড়তি হয় সাধনার। দোকানটা লিজে দেওয়া আছে। বিজনবাবুই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। মনটা অন্যদিকে ঘোরাবার চেষ্টা করল সাধনা। ঝগড়ার আওয়াজটা কমেছে। সাধনা ঠিক করল, এবার নিশ্চিন্তে বড়ি দেবে। বসতে গিয়ে কোমরে ব্যাথা অনুভব করল সে। অনেকদিন আর অভ্যেস নেই। কিন্তু একটু আধটু কষ্টকে এত পাত্তা দিলে সংসারে চলে না। নাতিটা বড়ি খেতে ভালোবাসে। বছর তিনেক আগে যখন বড়খোকা এসেছিল তখনই এক শিশি বড়ি তার হাতে পাঠিয়ে দিয়েছিল সাধনা। তারপর আর কাজের চাপে আসতে পারেনি। তাই এবারেও বেশ কিছুটা বড়ি ওর সঙ্গে দিয়ে দেবে বলে মনস্থির করেছে। একদিনের রোদে যদি বড়ি শুকনো হয় তার স্বাদ খুব মুচমুচে হয়। শাশুড়ির কাছে শেখা। গতকালই ডাল বেঁটে ফ্রীজে রেখেছিল। আজ তার সঙ্গে নুন -হলুদ-লঙ্কাগুঁড়ো আর সাদা তিল মিশিয়ে, একটা টিনের পাতে তেল মাখিয়ে চোখের নিমেষে টুপ টুপ করে অগুন্তি বড়ি দিয়ে ফেলল। ছাদে নামিয়ে নামাতে গিয়ে দেখল সকালের রোদ মিঠেকড়া ভাব নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

মনে মনে ছক কষে সাধনা। বাসি কাপড়গুলো সাবানজলে ভিজিয়ে আচারের শিশিগুলো ছাদের রোদে নামিয়ে দেয়। ওবাড়ির ছাদের দিকে চোখ যেতেই দেখে একঝাঁক এয়োস্ত্রী আলতা পরতে বসেছে। আনমনে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের সরস আলোচনা আবছা কানে আসে। হঠাৎই একজন বলে ওঠে, ‘এই চুপ’। সাধনা অপ্রস্তুত হয়ে সরে আসে।

(৫)

দেশ ছাড়ার পর ছ’মাসের মধ্যে মা আর ঠাকুমা চলে গেল। বাবা একটা খবরের কাগজের অফিসে অনেকদিন কাজ করে বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল। ভাড়া বাড়ি থেকেই ওদের দুইবোনের বিয়ে হয়। শেষ সময়ে বাবা আবার সেই দুঃসম্পর্কের মামার বাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছিল। ওখানেই প্রথমে উঠেছিল ওরা, দেশ ছেড়ে আসার পর। দেখতে ভালো ছিল, তাই বড় ঘরে বিয়ে হতে আটকায় নি। তবুও বাবাকে অনেককিছু বলার ছিল সাধনার। বাবার করুণ মুখখানি দেখে আর কিছুই বলা হয় নি। কত কথা বুকে চেপে রাখতে রাখতে দিন গড়াতে গড়াতে কবে যে চুলে পাক ধরে গেল!

ছাদ থেকে নেমে আসে সাধনা। সিঁড়ি বেয়ে নামতে আজকাল কষ্ট টের পায়। আয়নার সামনে দাঁড়ায় একটু। নিজের দিকে ভালো করে তাকায়। কিসের প্রতীক্ষায় এতগুলো বছর পার করে দিল সে? সিঁথির বাঁকে বাঁকে পাকাচুলগুলো কী পরিহাসে লিপ্ত? যখন বয়স ছিল তখন তো সব নিষেধকে বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিয়েছে। আজ এই নিঃসঙ্গ জীবনে কোন নিষেধের বেড়াজাল নেই। এটাই কি তবে সেই কাঙ্খিত সময় যার জন্য সে দিন গুনত? দাঁতে দাঁত চেপে অগ্রাহ্য করত সব না-পাওয়াকে, এই নিদারুণ একাকিত্বের যন্ত্রনার মধ্যে দিয়েই কি প্রতীক্ষার প্রহর সমাপ্ত হবে? 

গোপালের জামাকাপড় বদলে দিয়ে পুজোর বাসন নিয়ে কুয়োতলায় বসল সাধনা। মনে মনে গুনগুন করছে,

‘কৃষ্ণ ভজিবার তরে সংসারে আইনু /  না ভজিনু কৃষ্ণ নাম হুঁ হুঁহ্‌ হুঁ হুঁহ্‌ হুঁ / দিন গেল মিথ্যে কাজে রাত্রি গেল নিদ্রে / না ভজিনু কৃষ্ণ নাম শ্রী চরণারবৃন্দে।’

কাকটা আবার এসেছে। আবার একটা রুটি ছুঁড়ে দিল সাধনা।

– বৌদি-ই-ই…

– ওই এল এতক্ষণে।

ভোলার মা। কাজের মেয়ে। পুরনো। শাশুড়ির আমল থেকে কাজ করে। ও আসার পর সাধনা স্নানে যায়।

– দিন দিন তোর দেরির বহর বাড়ছে। কে কখন গেটে ডাকবে আমি সেই ভয়ে স্নানে যেতে পারছিনা। বলি আমার গোপাল কি না খেয়ে থাকবে?

– ওই গোপাল গোপাল করে তোমার চুলে পাক ধরল। বলি, দুটো ফুটোবে আর খাবে, ফুরিয়ে গেল। তোমার অত ঝামেলা করার কী দরকার বল দেকিনি? আমি পাঁচবাড়ি কাজ করি। আমার দেরি হবে। যে ঘরে আপিস কাছারি আচে সেকানিই তো আগে যাব নাকি? তোমার সব কাজ হলিই তো হল, অত সময়ের কী দরকার অ্যাঁ?

বলতে বলতে বাড়ির উঠোন বাগান সব ঝাঁট দিল ভোলার মা। যত বড় বাড়ি তার চাইতেও বড় বাগান। বড় বড় গাছ, আম-কাঠাল-নারকেল-পেয়ারা-বাতাবি-কুল। ছাদের কার্নিশে, বাগানের চারপাশে নানান জাতের ফুল। যে মরশুমে যা ফোটে তারই চারা নিয়ে আসে। নিজের হাতে লাগায় যত্ন করে। জীবনের কঠিন সময়ে এই গাছগুলোর সাথেও তো একটা আত্মিক টান টের পাওয়া যায়। কয়েকটা পুরোনো, কয়েটা সে নিজের হাতে লাগিয়েছে। এই গাছগুলোর তলায় বসে এদের সঙ্গে কত কথাই তো ভাগ করে নেয় সাধনা। বিশেষ করে টগরগাছটার সঙ্গে। তাই কাজের লোককে নির্দেশ দেওয়া আছে রোজ উঠোন বাগান ঝাঁট দিতে।

 স্নানের ঘর থেকে চিৎকার করল সাধনা, ‘তোর বড়দারা কলকাতা থেকে আসছে আজ। সকালে বেরোবে, তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলে জলখাবার খাবে। আজ একসপ্তাহ ধরে কান কামড়ে বলছি তোকে…’

ভোলার মা এঁটো বাসনগুলো বের করতে করতে গজ গজ করছে, ‘হুঁহ্‌, বড়দা আসচে, বড়দা আসচে আজ ছ-মাস ধরে শুনচি। বলি আসুক আগে! তবে তো লাপাবে! কপালে জোটেও বাবা যতসব। নেহাত মায়া পড়ে গেইচে তাই। নাইলে কবেই ছেড়ে দিতুম। আসচি একনো এই না কত, তার আবার একন লয় তকন!’

সাধনা পুজো করে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সাড়ে ন’টা বাজে। হাতে সময় আছে বেশ কিছুটা। শুকনো মুড়ির সঙ্গে পুজোর বাতাসা দুটো নিয়ে জলে ভিজিয়ে খেয়ে নিল। তারপর একটা আসন নিয়ে বসল সেলাই করতে। আসনের উপর দুটো বল্গা হরিণ ছুটে বেড়াচ্ছে দিশাহীন। সাধনা একটু অন্যমনস্ক হল… মনে হল আসলে সবাই ছুটছি অক্লান্ত, সীমাহীন। কিন্তু কিসের জন্য? খোকার বাবা তো অর্থ অর্থ করে কাটিয়ে দিল। যে ক’টা দিন বেঁচেছিল সেই অর্থ ভোগ করতে পারল কই? কোনওদিন একসাথে বসে দু’জনে চা পর্যন্ত খাইনি, তার সময় ছিল না। আজ মনে হয় কোন একটা জ্যোৎস্না রাত যদি দু’জনে একটু গল্প করে কাটাত? কোন একটা সকাল যদি দু’জনে মুখোমুখি বসে চা খেত? না, সময় থাকতে এ কথা মনে আসেনি একবারও। অথবা এলেও কথাগুলো ঠিক বলার মতো ছিল কিনা ভেবেই হয়ত বলা হয় নি। প্রত্যেকটা হেমন্তে ভোরাই-এর সুর শুনে ঘুম ভেঙেছে। প্রত্যেক শীত নিঃস্ব রিক্ত করে দিয়ে গেছে মনের আনাচ কানাচ। প্রতিটা বসন্ত জীবনকে শূন্য করে দিয়ে গেছে। অদ্ভুত, মানুষটা থাকতে এতখানি ছিল না, যতখানি আজ আছে। তার ঘর আজও তার নিয়মেই চলে। আজও গ্রীষ্মের দুপুরে আম-কাঁঠালের ডালি পৌঁছে যায় প্রতিবেশীর ঘরে। জন্মাষ্টমীর কাঁসর-ঘন্টায় মুখরিত হয় গোটা পাড়া। কোজাগরীর আলপনা মুগ্ধ করে পথ চলতি মানুষজনকে। শীত-বসন্ত জুড়ে গাঁদা-গোলাপ-ডালিয়া-চন্দ্রমল্লিকা আর বসন্তে শিমূল পলাশের পাপড়িগুলো বাগানময় হুল্লোরে মত্ত থাকে। পাশাপাশি প্রতিবেশী গিন্নীরা মস্করা করে বলে, যার জীবনে কিচ্ছুটি নেই তার অত সমারোহ মানায় না। কেউ কেউ কখনো সখনো ঠাট্টা ইয়ার্কির ছলে জিজ্ঞেস করে, ‘কী গো দিদি ছেলে আসছে নাকি?’ এই প্রশ্নে সাধনার অস্বস্তি যত প্রকট হয়ে ওঠে ওরাও তত মজা পায়। সাধনার মতো ভরভরন্ত অথচ শূন্য সংসার এ পাড়ায় কেন এ তল্লাটে একটিও নেই। যে বয়সে মৃত্যুচিন্তাই মুখ্য এবং একমাত্র হবার কথা সেই বয়সে অমন রমরমিয়ে সংসারী হওয়া যায়, এ যেন কল্পনার অতীত।

মানুষ আসলে কোনকালেই গতানুগতিকতার বাইরে কোনকিছুকেই মেনে নিতে পারে না । একটু অন্যথা ঘটলেই তার মতো করে সে কল্পনা করে নেয়। সাধনা বুঝেও না বোঝার ভান করে। আমগাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই যে সারাবছর জুড়ে তার কোন কাজ নেই শুধু গ্রীষ্মে ফল দেয়। তাকে তো কোনও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় না। শুধু থাকা আর ছায়া দেওয়াই যেন তার কাজ। গাছতলার মায়াটুকু ধরে রাখার মধ্যেই তার আনন্দ। এই পূর্ণতায় প্রবেশ করার পর তার আর খেয়াল না রাখলেও চলে কে কতটা জল দিয়েছে। সে থেকে যায় তার আপন খেয়ালে। শুধু মানুষের জীবনেই যত অনধিকার চর্চা! এতকিছু ভাবতে ভাবতেই তার হাত চলছে, নতুন নতুন দৃশ্যপটের ভিতর দিয়ে আসনের বল্গা হরিণ দুটো ছুটে চলেছে!!

প্রায় এগারোটা বাজে। বাইরে হঠাৎ চিৎকার উঠল। একটা গোঙানির আওয়াজে হাত থেমে গেল সাধনার। একটা সপাট-সপাট আওয়াজ আর গোঙানি, পালা করে চলছে! পাশের বাড়ির মাইক বন্ধ হয়ে গেছে। ভোলার মায়ের সাড়াশব্দ নেই। রাখীর গলা না? সাধনা জানলাটা ফাঁক করেই শিউরে উঠল।

– কী হচ্ছে এসব?

ছুটে বেরিয়ে এসে, পেল্লাই কালো গেট খুলে সোজা রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে সাধনা। যা সে সচরাচর করে না। রাখী রাস্তায় পড়ে আছে। সারা শরীর রক্তাক্ত। আর তার স্বামী উন্মত্ত অবস্থায় বেল্ট দিয়ে মেরেই চলেছে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য! সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ওখানে পাড়ার সকলেই প্রায় উপস্থিত। আট থেকে আশি, ছেলে-ছোকরা-বুড়ো অথচ কেউ কোন প্রতিবাদ করছে না! সাধনা ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে বলল

– ছাড়ো ওকে। ছেড়ে দাও বলছি।

ভোলার মাকে ধমক দিয়ে বলল, ‘এদিকে আয়। বলি মরে যাবে তারপর তুলবি?’

 এতক্ষণ বিনা বাধায় পৌরুষ প্রদর্শনের সুযোগ পেয়ে উন্মাদ হয়ে উঠেছিল লোকটা। অকস্মাৎ ধমকানি খেয়ে সেও একটু অবাক। চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখল সাধনা আর ভোলার মা পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে গেল রাখীকে। কালো গেট ভেতর থেকে বন্ধ হয়ে গেল। যেন নাটকের যবনিকা পতন হল। তারপর যে যার ঘরে চলে গেল। লোকটা অনেকক্ষণ ধরে লাফালাফি হম্বিতম্বি করে একসময় চুপ করে গেল।

ভোলার মা সাধনাকে বলল, ‘কী দরকার বাপু তোমার ইসব ঝামালায় জড়াবার? ওইজন্যি দাদাবাবু রাগ করে। জানো তো মিয়াটা ভালো না। কুতা কী করে এয়েচে তার ঠিক আচে? মেয়িমানসের এত বাড় ভালো লয়। এত লোকের কিচু এল-গেল না, তোমার একবারি দরদ উতলে উটল!’

সাধনা শুনতে না পাওয়ার ভান করে বলল, ‘ক’টা বাজে দেখ তো। বিজনবাবু বাজার নিয়ে ফেরে নি?’

ভোলার মা বলল, ‘সাড়ে এগারোটা। দাদাবাবুরা এবার এসে পড়বে মনে হয়।’

সাধনা এ কথার কোন উত্তর না দিয়ে বলল, ‘বিজনবাবু ফিরলে আমাকে একবার ডাকিস। একটা রিক্সো ডাকতে হবে। রাখীকে  হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার । তারপর  তুই বাড়ি চলে যাস।  আমার ফিরতে দেরি হতে পারে। ছাদের বড়ি আর আচারগুলো একটু ঘরে ভরে ছাদে চাবি দিয়ে দে।’

 ‘অ মা! তুমার এত কষ্টের বড়ি! আজ রোদও দারুণ, একুনি তুলে দোব?’

(৬)  

বেলা প্রায় তিনটে। রাখীর মাথায় ব্যান্ডেজ। বসে আছে মেঝেতে। দেওয়ালে হেলান দিয়ে। সাধনা একটু একটু করে পরোটা ছিঁড়ে একবার নলেন গুড় আর একবার আলুভাজা দিয়ে রাখীর মুখে পুরে দিচ্ছে। আর তার ছেলেদের ছোটবেলার গল্প শোনাচ্ছে। শোনাতে শোনাতে কখনও হেসে লুটিয়ে পড়ছে। কখনও চোখ পাকিয়ে বলছে, ‘খেয়ে নে। খাবি-দাবি, গতরে খাটবি। কাউকে ভয় পাবি না। ওই লোকটার সঙ্গে থাকার কী দরকার তোর? তোর খাটনির পয়সায় ওর মদের যোগান, তোর নামে বাজে কথা বলতে বাধে না, তোকে দু’বেলা মারধর করে, তবু ওই লোকটাকে নিয়ে কিসের এত সংসার করার সাধ তোর?’

‘মায়া পড়ি গেছে গো, খালি মনে হয় একদিন সব ঠিক হয়ি যাবে। ভগবানের দয়ায় একটা ছ্যালেপিলে হলিই সব ঠিক হয়ি যাবে। কত জায়গায় মানত করেচি, ওই জন্মাষ্টমীর দল আসলি ধূলায় গড়াগড়ি দি, ঠাকুরের দয়ায় কোল আলো করে একটা এলিই সব ঠিক হয়ে যাবে গো।’

সাধনার চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসে। এমনই অপেক্ষা ছিল তারও জীবনে। তারপর? অপেক্ষা যে সারা জীবনটাকে এভাবে গ্রাস করবে সেদিন তো জানত না। তাই অবলীলায় কতকিছু অগ্রাহ্য করেছে! কত না-পাওয়ায় ভরা জীবনে অপেক্ষাটুকু শুধু আজীবন সঙ্গ দিয়ে গেল! ফোনটা বেজে চলেছে, বড় খোকার নামটা জ্বলজ্বল করছে!

– হ্যালো।

– উফ্ মা, সারাদিন ফোন করছি। ফোনটা ধরো না কেন? একটা এস এম এস করেছি। দেখেও রিপ্লাই দাওনি। আমাদের তো চিন্তা হয় নাকি?

– চিন্তার কিছু নেই। একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম তাই…

– তোমাকে না পেয়ে বিজনকাকুকে ফোন করেছিলাম। শুনলাম সব। বার বার তোমাকে বলেছি এসব উটকো ঝামেলায় জড়িয়ো না। তুমি একা থাক। যাই হোক। সামনের মাসেই যাব আশা করছি। ততক্ষণ একটু সাবধানে থেকো।

সাধনা লাইন কেটে দিয়ে আর একবার মেসেজগুলো দেখল। সকালে দেখেছিল একবার খুব তাড়াহুড়ো করে। তখন বাইরে তুমুল চেঁচামেচি। পুরোটা পড়া হয়নি। শুধু শেষের লাইনটা স্ক্রিনে উঠেছিল‘… সামনের মাসে দেখা হচ্ছে, কেমন?’ এখন পুরোটা পড়ল, ‘মা, গতকাল রাত্রেই আমার শ্যালক ফোন করেছিল। অত রাতে তোমাকে আর ডিস্টার্ব করলাম না। সামনের অঘ্রাণে ওর বিয়ে। তখন যেতেই হবে। তাই এ মাসে আর ছুটিটা ফালতু নষ্ট করলাম না। সামনের মাসে দেখা হচ্ছে, কেমন?’

সাধনা দেখল রাখী আসনটা হাতে তুলে নিয়ে বুনতে শুরু করেছে। বল্গা হরিণদুটো আবার ছুটছে। সাধনা গুনগুন করে গেয়ে উঠল,

‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া, / বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।’

জিনিয়া ব্যানার্জ্জী অধিকারীর বীরভূম জেলার ইন্দাশ গ্রামে জন্ম। গ্রাম জীবনের অপার আনন্দ গায়ে মেখে বড় হওয়া। ছাত্রজীবন ছড়িয়ে ছিল নিজের গ্ৰাম, প্রতিবেশী গ্ৰাম বিপ্রটিকুরী এবং লাভপুর জুড়ে। পরবর্তী পড়াশোনা বর্ধমান বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্য নিয়ে। বৈচিত্রময় ছাত্রজীবন প্রথাগত শিক্ষার সঙ্গে সামাজিক বৈচিত্র্যকে দেখতে ও চিনতে শিখিয়েছে। জিনিয়া বর্তমানে বোলপুর স্কুলবাগানের বাসিন্দা এবং আকাশবাণীর ঘোষিকা হিসেবে শান্তিনিকেতনে কর্মরতা।

বড়পিসির সান্নিধ্যে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল ছোটবেলা থেকেই। কবিতা পাঠ করতে ভালোবাসেন আর ভালোবাসেন মানুষের সঙ্গে মিশতে।

1 thought on “সারশূন্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *