অনুবাদ – সুস্মিতা সরকার মৈত্র

মূল গল্প – অ্যালিস ওয়াকার (দা রিভেঞ্জ অফ হানা কেমহাফ)

সবে সপ্তাহ দুই হলো রোজি মাসিমার কাছে শিক্ষানবীশ হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছি তখন। একদিন এক মহিলা এলেন আমাদের কাছে। খুবই বয়স্ক। একগাদা জামাকাপড়, শাল, স্কার্টে মোড়ানো তাঁকে দেখে মনে হলো তিনি যেন একবাটি খাবার, যেটা ঢেকেঢুকে রাখাই নিয়ম। “আরে, আপনি হানা কেমহাফ না? হাওয়ায় আপনার নাম লেখা আছে, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এমনকি এটাও দেখতে পাচ্ছি যে আপনি ইস্টার্ন স্টার দলের লোক”, রোজি মাসিমা বলে উঠলেন।

ভদ্রমহিলা তো রীতিমত হাঁ! সেই সঙ্গে আমিও। অবশ্য পরবর্তী সময়ে আমি জানতে পেরেছি যে দেশের প্রায় প্রতিটা মানুষের সম্পর্কে অনেক তথ্য ওঁর কাছে রাখা আছে। সেসব তথ্য ফাইল বন্দি হয়ে ওঁর খাটের নিচে বাক্সর মধ্যে থাকে। মিসেস কেমহাফ অবাক গলায় জানতে চাইলেন, রোজি মাসিমা তাঁর সম্পর্কে আর কী কী জানেন।

রোজি মাসিমার টেবিলে সবসময় জল ভর্তি একটা বিশাল পাত্র রাখা থাকে। একোরিয়ামের মতন হলেও ওখানে কোন মাছ থাকে না। অন্তত আমি আজ পর্যন্ত তাতে জল ছাড়া কখনও একটা মাছও দেখতে পাই নি। অবশ্য রোজি মাসিমা ঠিকই দেখতে পান। এদিকে ভদ্রমহিলা উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছেন, আর রোজি মাসিমা মন দিয়ে জলের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। কিছুক্ষণ পর বললেন যে জলটা ওঁর সঙ্গে কথা বলছে। আর সেখান থেকেই উনি জানতে পারলেন যে মিসেস কেমহাফকে দেখলে একদম বুড়ি বলে মনে হলেও, আসলে তাঁর অতটা বয়সও হয়নি। মাসিমার কথাটা মিসেস কেমহাফ একবাক্যে মেনে নিলেন। তারপর জানতে চাইলেন রোজি মাসিমা কি তাঁর এই বয়স্ক চেহারার কারণটাও জানেন নাকি? এবার রোজি মাসিমা বললেন যে সেটা তিনি না জানলেও এখন জানতে চান। প্রথমে মিসেস কেমহাফ একটু ইতস্তত করছিলেন। তিনি ঠিক চাইছিলেন না আমি ওনাদের সামনে থাকি। কিন্তু রোজি মাসিমা বললেন যে আমি সবকিছু শেখার চেষ্টা করছি। তাতে উনি মাথা নেড়ে জানালেন যে তিনি বুঝতে পারছেন, আর আমি ওখানে থাকলে ওঁর কোনও আপত্তি নেই। এসব শুনে আমি তো কুঁচকেমুচকে যতটা সম্ভব ছোট হয়ে রোজি মাসিমার টেবিলের এক কোনায় হাসিহাসি মুখ করে বসে থাকলাম যাতে উনি অস্বস্তি বোধ না করেন বা ভয় না পান।

উনি এতগুলো শাল গায়ে দিয়েছেন যে মনে হচ্ছে যেন ওঁর পিঠে কুঁজ গজিয়েছে। সেই শাল গুছিয়ে টুছিয়ে নিয়ে নিজের চেয়ারে নড়েচড়ে বসে বলতে শুরু করলেন, “এটা শুরু হয়েছিল যখন বিশ্বজুড়ে আর্থিক মন্দা চলছে।”

“বুঝতে পেরেছি। তখন তো আপনার বয়সটাও অনেক কম ছিল আর আপনি আরও অনেক সুন্দর ছিলেন।” রোজি মাসিমা বললেন।

বলা মাত্রই উনি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, “আরে, আপনি জানলেন কী করে! একদম ঠিক বলেছেন তো! ভাবুক চোখের স্বামী আর চারটে ছোট বাচ্চা নিয়ে ততদিনে প্রায় বছর পাঁচেকের বিবাহিতা আমি। অবশ্য আমার বিয়েটাও খুব অল্প বয়সেই হয়েছিল।”

“কী আজব ব্যাপার! আপনি নিজেই তো তখনও একটা বাচ্চা মেয়ে!” রোজি মাসিমা মন্তব্য করলেন।

“হ্যাঁ, আমার তখন কুড়ি বছরও হয় নি। সর্বত্রই তখন এক কঠিন অবস্থা। শুধু সারা দেশে না, আমার তো মনে হয় পুরো পৃথিবী জুড়েই তখন একই রকম বাজে পরিস্থিতি। আসলে তখন তো কারো বাড়িতেই টিভি ছিল না, তাই আমরা সব খবর জানতেও পারতাম না। এমনকি আমি তো এটাও জানি না যে এসব শুরু হলো কীভাবে! অবশ্য আমাদের একটা রেডিও ছিল। তাসের জুয়া খেলায় জিতেছিল আমার স্বামী। সেই আর্থিক মন্দা শুরুর আগে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা আমরা বিক্রি করে দিয়েছিলাম স্রেফ খাবার জোগাড় করার তাগিদে। সে যাকগে। আমার সামান্য রোজগারে যতদিন সম্ভব আমরা বাঁচার চেষ্টা করছিলাম। একটা করাতকলে রাঁধুনির কাজ করতাম আমি। কুড়িজন লোকের জন্য বাঁধাকপি আর ভুট্টা রান্না করে সপ্তাহে দু’ডলার পেতাম। কিন্তু তারপর একদিন সেই মিলটাও বন্ধ হয়ে গেল। ওদিকে আমার স্বামী অনেকদিন থেকেই চাকরি বাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে ঘরে বসে। আমাদের তখন প্রায় না খেয়ে থাকার মতন অবস্থা। না খেতে পেয়ে বাচ্চাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছিল। শেষে খিদের জ্বালায় বাগানের শেষ সবজিটুকু শেকড় সহ তুলে রান্না করে ফেললাম। সেটা খাওয়ার পর আমাদের আর কিছুই বাকি থাকল না।

আগেই যেমন বললাম, আমাদের তো কারো টিভি ছিল না, আর রেডিওটাও বিক্রি করে দিয়েছিলাম, তাই সর্বত্রই এরকম কঠিন পরিস্থিতি চলছিল কিনা তা জানার কোনও উপায় ছিল না। তবে আমরা যে অঞ্চলে থাকতাম, সেই চিরোকি অঞ্চলে আমাদের পরিচিত সবার একই হাল হয়েছিল। সরকার থেকে খাবারের কুপন দিচ্ছিল। কেউ অনাহারে আছে সেকথা প্রমাণ করতে পারলে তবেই সেই কুপন পাওয়া যাবে। কয়েকটা কুপন জোগাড় করতে পারলে শহরের একটা জায়গায় গিয়ে অনেক বেশি খাবার জোগাড় করা যাবে। ততদিনে আমরা মরিয়া হয়ে উঠেছি। আমার স্বামী চাইছিল যে আমরা খাবার জোগাড়ে যাই। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, আমার একটুও ইচ্ছে করছিল না। আসলে কী বলুন তো, আমার বাবা চিরোকি অঞ্চলের সবথেকে বড় চাষি ছিল। আর আমাদের কোনদিনই কারোর কাছে কিছু ভিক্ষে চাইতে হয় নি। তাই এভাবে কুপন নিয়ে খাবার জোটাতে আমার সম্মানে বাঁধছিল।

“ইতিমধ্যে আমার বোন ক্যারি মে…”

“আমার যতদূর মনে পড়ছে, আপনার বোন বেশ ডাকাবুকো এক মহিলা, তাই না?” রোজি মাসিমা জানতে চাইলেন।

“ঠিক। খুব সাহসী ছিল আমার বোন। আত্মবিশ্বাসীও।” বললেন মিসেস কেমহাফ। “ও তখন শিকাগোর উত্তর দিকে থাকত। ওখানে কয়েকটা সাদা লোকের কাছে কাজ করত। ওরা বেশ ভালো লোক ছিল। মাঝামাঝেই পুরনো জামাকাপড় দিত আমাদের দেওয়ার জন্য। সেগুলো পেয়ে আমরা সবাই খুব খুশি হতাম। কারণ, এটুকু স্বীকার করতেই হবে যে পুরনো হলেও সেসব জামাকাপড় যথেষ্ট ভালো হতো। তখন ধীরে ধীরে ঠাণ্ডাটা বেশ জাঁকিয়ে নামছে। তাই আমার স্বামী, বাচ্চারা আর আমি নিজে ওদের দেওয়া জামাকাপড়ে তৈরি হলাম যাওয়ার জন্য। আসলে ওদের দেওয়া জামাকাপড়গুলো উত্তরের অনেক বেশি ঠাণ্ডা আর বরফের পরিবেশে পরার জন্য তো, তাই অনেক বেশি গরম।”

“ক্যারি মে’কে এক গুন্ডা নেতা খুন করেছিল, তাই তো?” রোজি মাসিমা প্রশ্ন করলেন।

“হ্যাঁ। ঠিক তাই। ঐ গুন্ডা নেতা আবার ওরই স্বামী ছিল।” নিজের গল্পটা বলার জন্য ব্যগ্র হানা তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন।

হ্যাঁ, তা যা বলছিলাম। আমরা সবাই ঐ ভালো ভালো জামাকাপড়ে নিজেদের সাজালাম। তারপর চললাম সরকারের কাছ থেকে আমাদের পাওনাগণ্ডা আদায় করতে। তখন আমাদের পেটে ছুঁচোয় রীতিমত ডন বৈঠক দিচ্ছে। তবুও আমাদের চেহারায় এক অদ্ভুত ডাঁট ফুটে উঠছিল। আসলে একসময় আমরা যে বড়লোক ছিলাম, আমার বাবা বেশ পয়সাওলা ছিল, সেকথা মনে পড়লেই আমাদের অহংকার হয়। এমনকি ঠিকঠাক পোশাক পরলে আমার স্বামীরও বেশ গর্ব গর্ব ভাব হয়।”

“পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, তোমাদের যাত্রাপথে একটা ফ্যাকাসে শয়তানের ছায়া ঘনিয়ে আসছে…” জলের দিকে তাকিয়ে রোজি মাসিমা বলে উঠলেন। যেভাবে উনি জলটার দিকে তাকিয়ে আছেন, তাতে মনে হচ্ছে যেন আমাদের দৃষ্টির অগোচরে ওনার কিছু পয়সা হারিয়ে গিয়েছে ওখানে।

“তা যা বলেছেন। সত্যিই সেই ফ্যাকাসে শয়তানটা ছায়ার মতোই আমাদের গিলে খেয়েছিল। জায়গা মতন পৌঁছে দেখি সে এক বিশাল লাইন। সেই লাইনে আমাদের সব বন্ধুদেরই দেখতে পেলাম। খাবারের স্তুপের একপাশে সাদা চামড়ার লোকের লাইন। সেখানে বেশ কিছু বড়লোকও ছিল। আর অন্যদিকে কালো লোকের লাইন। ও হ্যাঁ, পরে শুনেছি সাদা আর কালো লোকের জন্য আলাদা খাবার ছিল। কারণ আমরা কালো লাইনের লোকজন না পেলেও সাদা লাইনের লোকেরা বেকন আর গ্রিট আর বেশ কিছু ভালো ভালো খাবার পেয়েছে। যাই হোক। লাইনে দাঁড়ানোর পর কী হলো সেটা বলি। আমাদের বন্ধুরা যেই না দেখেছে যে আমরা ভালো পোশাক পরে লাইনে দাঁড়িয়েছি, অমনি বলা শুরু করল যে আমাদের নির্ঘাত মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। নাহলে এমন ভালো জামাকাপড় পরে কেউ আসে ভিক্ষা চাইতে? আমাদের জামাকাপড় যতই পুরনো হোক না কেন, ঐ লাইনের দাঁড়ানোর জন্য বড্ড বেশি ভালো। বন্ধুদের এসব কথা শুনে আমার হুঁশ এল। তাকিয়ে দেখি কালো লাইনের সবাই একেবারে ছেঁড়াখোঁড়া জামা পরে আছে। এমনকি যাদের বাড়িতে ভালো জিনিসপত্র আছে বলে আমি জানি, তারাও। কী ব্যাপার বলতো, এর মানেটা কী? বরের কাছে জানতে চাইলাম আমি। তার কাছেও কোন উত্তর ছিল না। ও তখনও ভালো পোশাক পরিচ্ছদের অহংকারে মটমট করছে। কারোর কোনও কথাতেই কান দেওয়ার মেজাজে নেই। কিন্তু আমার ভয় হলো। আমার ভয় দেখে সবথেকে ছোট বাচ্চাটা কাঁদতে শুরু করল। আর তাই দেখে বাকি ছেলেমেয়েরাও ঘ্যানঘ্যান শুরু করল। সবমিলিয়ে সে যাকে বলে এক বিতিকিচ্ছিরি দশা।

আর এরকম সময় আমার স্বামী আমাদের আশেপাশে দাঁড়ানো মহিলাদের মাপতে শুরু করল। মানে ওই যাকে বলে ঝাড়ি মারতে শুরু করল আর কী। তাই দেখে আমার তো ভয়ে প্রাণ উড়ে যাওয়ার অবস্থা। এবার না আমার স্বামীই আমার হাতছাড়া হয়ে যায়! এমনিতেই লোকে আমাকে অহংকারী আর দুর্বিনীত বলে খোঁচা দেয়। আমি অবশ্য এটাই বলি যে সবারই এরকম আত্মসম্মানবোধ থাকা উচিত। তার নিজেরও সেই চেষ্টাই করা উচিত। কিন্তু এখন এই কারণে যদি সবার সামনে লজ্জায় পড়ি তাহলে আর দেখতে হবে না। ও নির্ঘাত আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।”

কাজেই ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি শুধু একটা কথাই মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম যেন সাদা লোকগুলো এটা খেয়াল না করে যে আমি বেশ ভালো জামাকাপড় পরে আছি। আর নেহাত যদি দেখেও তাহলে যেন এটাও দেখে যে আমাদের বাচ্চাগুলো খিদেয় কাহিল হয়ে আছে। আমাদের সবারই অবস্থা কতোটা করুণ! ওদিকে আমার স্বামী কেমন ধূর্ততার সঙ্গে এক মহিলার সঙ্গে গপ্প জুড়েছে সেটাও আমার নজর এড়ায় নি। মহিলার পোশাকআশাক দেখলে মনে হবে যেন মাছি ভনভন করছে। একে তো ছেঁড়াখোঁড়া তার উপর প্রচণ্ড নোংরা। একেবারে যাচ্ছেতাই রকম নোংরা। দেখে তো আমার গা ঘিনঘিন করে উঠছিল। কিন্তু তাতে কার কী! এদিকে চারটে বাচ্চা নিয়ে আমি লাইন সামলাচ্ছি আর ওদিকে আমার বর পারলে সেই নোংরা জামাকাপড় পরা মহিলার একেবারে ঘাড়ের উপর উঠে বসে। আমি জানি ঐ মহিলার বাড়িতে অনেক ভালো ভালো কাপড়জামা আছে। মনে হয় আমার বরও সেটা জানে। ঐ মহিলা বরাবরই আমার থেকেও ভালো জামাকাপড় পরত। এমনকি ওর পোশাকআশাক অনেক সময় সাদা মহিলাদের থেকেও ভালো হতো। তার অবশ্য কারণ আছে। লোকে বলে ও নাকি আসলে বেশ্যা। আর সেজন্যই ওর বেশ ভালো রকম টাকা পয়সা। ভাবগতিক দেখলে তো মনে হয় এই মন্দার বাজারেও লোকে শুধু ওটাই চায়। তার জন্য খরচ করতেও তাদের কোনও অসুবিধে নেই।”

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলেন উনি। একটা লম্বা শ্বাস নিলেন। তারপর আবার শুরু করলেন।

“কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি কাউন্টারের মহিলার সামনে পৌঁছে গেলাম। ভদ্রমহিলার বয়স তখন বেশ অল্প। ওখানে দাঁড়িয়ে খাবারের গন্ধে আমার জিভে জল এসে যাচ্ছিল। এমনিতে যতই ডাঁটে থাকি না কেন, কখনোই খুব বাড়াবাড়ি কিছু তো চাই নি আমি। আমার বাচ্চাদের জন্য আর আমার জন্য সামান্য কিছু খাবার হলেই চলবে। আর সে জন্যই সব দীনতা উপেক্ষা করে আমি লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার ছেলেমেয়েরা আমার জামা খামচে ধরে আছে। আমার বড় ছেলেটাকেও সোজা হয়ে লাইনে দাঁড় করিয়েছি। কিন্তু, যতই হোক, আমি তো ঠিক ভিক্ষে চাইতে আসি নি। আমি আমার যা প্রাপ্য শুধু সেটুকুই চাই। তাই, ঠিক ভিখারির মতন হাবভাব করা আমার পোষাবে না। এরপর কী হলো জানেন? সেই বড় বড় নীল চোখ আর হলুদ চুলওলা মহিলা আমার থেকে আমাদের কুপনটা নিল। তারপর আমার স্বামী, ছেলেমেয়ে আর আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। বোধহয় মনেমনে ভাবছিল সবাই তো দেখি একেবারে পরিপাটি সাজগোজ করে এসেছে! আমার কুপনটা হাতে নিয়ে এমন করে দেখছে, যেন ভীষণ নোংরা কিছুর দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ দেখে টেখে তারপর সেটা আমার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক জুয়াড়িকে দিয়ে দিল! আর আমাকে বলল, ‘তোমার সাজগোজ দেখে মনে হচ্ছে না যে তোমার এখানে খাবার নেওয়ার কোনও দরকার আছে!’ আমি কাতর অনুনয় করে বললাম, ‘কিন্তু মিস স্যাডলার, আমার বাচ্চারা খিদেতে মরে যাচ্ছে।’ ‘ওদের দেখে মনেই হচ্ছে না যে ওদের খিদে পেয়েছে। যাও, এখন এখান থেকে সরে যাও। অন্য কেউ বরং সত্যিই আমাদের দেওয়া খাবারে উপকৃত হতে পারে।’ একথা শুনে আমার পিছনে দাঁড়ানো কেউ কেউ হাসি চাপলেও অনেকেই জোরে জোরে হাসতে শুরু করল। ঐ সাদা মহিলাও মুখে হাত দিয়ে তার বাঁকা হাসি লুকিয়ে বুড়ো জুয়াড়িটাকে এমনিতে যতটা দেওয়ার কথা তার দ্বিগুণ খাবার দিল। এদিকে তখন আমি, আমার ছেলেমেয়েরা খিদেয় আর দাঁড়াতে পারছি না।

এসব বেগতিক কাণ্ড দেখে আমার বর আর সেই মহিলাও হাসতে শুরু করল। তারপর আমার বর নিচু হয়ে ঝুঁকে মহিলার পাওয়া খাবারদাবার আর অন্যান্য জিনিসপত্র তুলতে শুরু করল। তখন আমার মনের এমন অবস্থা যে ঐ মহিলার খাবারদাবার দেখে মনে হচ্ছে যেন পর্বতপ্রমাণ খাবার। তারপর একজনের গাড়িতে সবকিছু তুলে নিয়ে ঐ মহিলার সঙ্গে ও চলে গেল। সেটাই শেষবার। তারপর আর কখনও ওকে বা ঐ মহিলাকে দেখিনি আমি।”

“ওরা সেই যে বন্যায় টিউনিকা শহর ভেসে গিয়েছিল সেই বন্যায় ভেসে গিয়েছে, তাই না?” রোজি মাসিমা জানতে চাইলেন।

“একদম ঠিক বলেছেন। তখন আপনার মতন কেউ থাকলে হয়তো আমার খুব ভালো হতো। হয়তো তিনি আমাকে সাহায্য করতে পারতেন। অবশ্য এখন মনে হয় আমার সাহায্যের প্রয়োজন ছিল না।” বললেন মিসেস কেমহাফ।

“তারপর কী হলো?”

“তারপর আর কী! তারপর আমার সমস্ত জীবনীশক্তি যেন শেষ হয়ে গেল। বাচ্চাদের নিয়ে কোনওরকমে একজনের গাড়িতে করে বাড়ি ফিরলাম। আমাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন প্রচুর মদ গিলে মাতাল হয়ে গিয়েছি। ছেলেমেয়েদের ঘুম পাড়ালাম। ওরা খুবই লক্ষ্মী বাচ্চা। কেউই বিশেষ ঝামেলা কিছু করে নি। কিন্তু খিদের জ্বালায় যেন পাগল হয়ে যাচ্ছিল ওরা।”

এতক্ষণ শান্ত মুখে কথা বললেও এখন ওঁর চোখেমুখে এক গভীর বিষাদ ছেয়ে গেল।

“আগে বড়জন অসুস্থ হলো। তারপর একে একে সবারই শরীর খারাপ হতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত সবাই মারা গেল। সেই বুড়ো জুয়াড়িটা তিন চার দিন পর আমাদের বাড়িতে এসে ওর কাছে যতটা খাবার বেঁচে ছিল সেটা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিল। ওখান থেকে ফেরার সময়ই সে জুয়া খেলতে চলে গিয়েছিল। ঈশ্বরের পরম করুণায় ক’দিন পর তার টনক নড়ে। সে আমাকে চিনত। এটাও জানত যে আমার স্বামী আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। তাই সে আমাদের খুশি মনেই সাহায্য করতে চেয়েছিল। কিন্তু ততদিনে বেশ অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছে। ততদিনে, আমার ছেলেমেয়েরা মারা গিয়েছে। ঈশ্বর ছাড়া আর কারো ক্ষমতা ছিল না ওদের বাঁচানোর। আর তিনি মনে হয় অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। হয়তো আমার ছেলেমেয়ের জীবনের থেকেও সেই বসন্তে সেই নীচমনা সাদা মহিলার বিয়েটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছিল ঈশ্বরের।” দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বললেন তিনি।

“যেমন স্বামীর চলে যাওয়া সামলে উঠতে পারেনি আমার মন, যেমন খিদেয় প্রায় মরোমরো হওয়ার ধকল সামলে উঠতে পারেনি আমার শরীর, ঠিক তেমনই আমার অন্তরাত্মাও সেদিনের সেই অপমান কিছুতেই সামলে উঠতে পারেনি। ওই শীতেই আমি শুকিয়ে যেতে শুরু করি। প্রতি বছরই যেন আমি আগের বছরের থেকেও বেশি শুকিয়ে যাচ্ছিলাম। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার অহংকার উবে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত আমার আত্মসম্মানও আমাকে ছেড়ে চলে গেল। সামান্য কিছু রোজগারের আশায় আমি কিছুদিন বেশ্যালয়েও কাজ করেছি। আমার স্বামীর সেই রক্ষিতার মতই। তারপর আমার নিজের দুরবস্থা ভোলার জন্য মদের নেশাকে আঁকড়ে ধরলাম। আর তারপরই একদম সর্বনাশ হয়ে গেল আমার। হঠাৎ করেই খুব তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে গেলাম। ঠিক এখন যেমন দেখছে পাচ্ছেন আমাকে। আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে আমি চার্চে যাওয়া শুরু করেছি। আবার নতুন করে দীক্ষা নিলাম। আসলে আগের বারের দীক্ষাটা যেন আর কাজ করছিল না বলে মনে হচ্ছিল আমার। কিন্তু তাও যে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না। আমি এখনও সেই সাদা মহিলাকে দেখি আমার দুঃস্বপ্নে। সেদিনের সেই অপমানের মুহূর্তটা সবসময়ই মনে পড়ে। সেদিন যখন সবার ব্যঙ্গ আর হাসির সামনে আমার আত্মসম্মান ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছিল, তখন সেই সাদা মহিলা মুখে হাত চাপা দিয়ে বাঁকা হাসি হাসছিল।”

“শোন, অন্তরাত্মাকে যেমন গড়ে তোলার উপায় আছে, তেমনই সেটা ভাঙ্গারও রাস্তা আছে। কিন্তু, দুটোই একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। তোমার লজ্জার অনুভূতিটাকে যদি সরাতে হয়, তাহলে সেটা অন্য কারো উপর চাপাতেই হবে আমাকে।”

“আমার মনে হয় না আমি আদৌ সেরে উঠব। সত্যি কথা বলতে কী আমি চাইও না সেরে উঠতে। আমাদের সম্পর্কে কিছুই জানে না এমন একজন মহিলা আমার স্বামী সন্তানদের কেড়ে নিয়েছে, সেই লজ্জা সহ্য করে বেঁচে আছি, এটাই অনেক। যতদিন বাঁচব ততদিন এই তিক্ততা নিয়েই বেঁচে থাকতে পারব। কিন্তু একটা জিনিস খুব জানতে ইচ্ছে করে। ঐ নীচ সাদা মহিলা কেমন আছে সেটা জানতে পারলেই আমি শান্তিতে মরতে পারতাম। যেখানে আমি এতো কষ্ট পাচ্ছি, সেখানে সেই নীচ মহিলা যদি সুখে থাকে, আনন্দে থাকে তাহলে ভগবানের এটা কেমন বিচার হবে বলুন তো! সেটা কি খুব অমানবিক একটা ব্যাপার হবে না!”

“এসব ভেব না”, খুব কোমল কণ্ঠে বললেন রোজি মাসিমা। “মানব দেবতার আশীর্বাদে আমি অনেকরকম ক্ষমতার ব্যবহার জানি। সেই ক্ষমতা আমাকে মানব দেবতাই দিয়েছেন। নিজের হাতে। শত্রুর দৃষ্টি যদি তোমার সহ্য না হয়, তাহলে মানব দেবতা, যিনি আমার সঙ্গে কথা বলেন, সেই দৃষ্টি ধ্বংস করে দেন। শত্রুর হাত যদি তোমাকে ছোঁয়, তাহলে সেই হাত অকেজো করে দেওয়ার ক্ষমতা আছে মানব দেবতার।” কথাটা বলতে বলতে একটা ধাতব টুকরো তুলে ধরলেন উনি। একসময় ঝকঝকে থাকলেও এখন ঐ ধাতব টুকরোটা কালো হয়ে গিয়েছে। জায়গায় জায়গায় ভেঙ্গেও গিয়েছে।

“এই ধাতুর টুকরোটা দেখছ তুমি?”

“হ্যাঁ, দেখছি।” খুব আগ্রহের সঙ্গে টুকরোটা হাতে নিয়ে ঘষলেন মিসেস কেমহাফ।

“ঐ নীচ সাদা মহিলার যতটুকু তুমি চাও যে ধ্বংস হয়ে যাক, ততটুকু এই ঠিক এভাবেই, এই ধাতুর টুকরোটার মতই নষ্ট হয়ে যাবে।” রোজি মাসিমা বললেন।

“আপনিই আমার সবথেকে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। একদম আমার মায়ের পেটের বোনের মতন।”

“সেটা হলে তুমি খুশি হবে তো?”

“হাতের আড়ালে ঐ যে ব্যঙ্গের হাসি হাসছিল, সেটা বন্ধ করার জন্য যা লাগে আমি তাই দিতে রাজি।”

“কী চাও তুমি সেটা আমাকে বল। ওর হাসি বন্ধ করতে নাকি ওর হাতের নড়াচড়া থামিয়ে দিতে?”

“হাসিটা ছিল ওর মুখে, আর হাত দিয়ে সেটা আড়াল করছিল।” মিসেস কেমহাফ বললেন।

“দেখো, একটা জায়গার জন্য দশ ডলার, আর দুটো জায়গা অচল করতে চাইলে তোমাকে কুড়ি ডলার দিতে হবে।” রোজি মাসিমা জানালেন।

“তাহলে আপনি ওর মুখটাই অচল করে দিন। কারণ আমার দুঃস্বপ্নে ঐ মুখের চেহারাটাই বারবার ঘুরেফিরে আসে।” বলতে বলতে সে একটা দশ ডলারের নোট রোজি মাসিমার কোলে রেখে দিল।

“আচ্ছা, এবার আমি বলি আমরা ঠিক কী করব।” মিসেস কেমহাফের দিকে এগিয়ে এসে ডাক্তার যেমন তার রোগীর সঙ্গে খুব নরম সুরে কথা বলে তেমন নরম সুরে কথাটা বললেন রোজি মাসিমা। “প্রথমে আমরা একটা জোলাপের মতন জিনিস তৈরি করব। যেমনটা আমরা আমাদের কাজের ক্ষেত্রে বহুকাল থেকে ব্যবহার করি আর কি! এটা যার জন্য বানানো হচ্ছে তার চুল, নখ, একটু মল-মূত্র এসব দিয়ে বানানো হবে। আর লাগবে তার ব্যবহার করা একটুকরো কাপড়। এক্ষেত্রে আমরা কবর থেকে তুলে আনা মাটিও একটু মেশাবো। ব্যাস, তাহলেই কাজ হবে। ঐ মহিলা তোমার মৃত্যুর ছয় মাসের মধ্যেই মরবে।”

ব্যাপার স্যাপার দেখে আমি ভাবছিলাম যে ওরা দু’জন হয়তো আমার কথা ভুলেই মেরে দিয়েছে। এখন রোজি মাসিমা আমার দিকে ফিরে বললেন, “তুমি এক কাজ কর। মিসেস কেমহাফের সঙ্গে ওঁর বাড়ি চলে যাও। উনি যখন অভিশাপ মন্ত্র উচ্চারণ করবেন তখন ওঁকে শিখিয়ে দিতে হবে কীভাবে কী করতে হবে। তুমি ওঁকে দেখিয়ে দেবে কালো মোমবাতিগুলো কীভাবে সাজাতে হবে, আর নিজের কাজটা মারণদেবকে দিয়ে করিয়ে নিতে গেলে কেমন করে তাঁর ভজনা করতে হবে।”

তাঁর হাজারগণ্ডা জিনিস রাখা থাকে যে তাকে, সেদিকে গেলেন উনি। কী নেই সেখানে! সৌভাগ্য বয়ে আনবে এরকম তেল, দুর্ভাগ্যের কারণ হবে এমন তেল, শুকনো ভেষজ, নানান ক্রিম, পাউডার, আর হরেকরকমের মোমবাতি। সেখান থেকে তিনি দুটো বড় বড় কালো মোমবাতি নিয়ে মিসেস কেমহাফের হাতে দিলেন। একটা ছোট প্যাকেটে করে কিছু একটা গুঁড়োও ওঁর হাতে দিয়ে বললেন, “শোন, মারণমন্ত্র আবৃত্তি করার সময় এই গুঁড়োটা তোমার টেবিলের উপর রেখে জ্বালিয়ে দিলেই এটা কাজ করবে। আর ও তোমাকে দেখিয়ে দেবে এই মোমবাতিগুলোকে ভিনিগার দিয়ে কীভাবে তোমার কাজের জন্য পবিত্র করে তুলতে হবে।” 

এরপর উনি আরও বললেন যে মিসেস কেমহাফকে পরপর ন’দিন রোজ সকাল সন্ধ্যে এই মোমবাতি জ্বালিয়ে ঐ গুঁড়ো পুড়িয়ে মারণমন্ত্র উচ্চারণ করতে হবে। আর সবটাই করতে হবে হাঁটুর উপর ভর দিয়ে বসে বসে। মনকে একাগ্র করে মারণদেবের কাছে নিজের মনের কথা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের সর্বশক্তিমান মা শুধুমাত্র মারণদেবের কথাই শোনেন। রোজি মাসিমা নিজেও রোজ মিসেস কেমহাফের সঙ্গে একই সময়ে মারণমন্ত্র আবৃত্তি করবেন। উনি মনে করেন দুজনে মিলে ভক্তি সহকারে একই সঙ্গে প্রার্থনা করলে খুশি না হয়ে মারণদেবের কোনও উপায় থাকবে না। তারপর তিনি মৃত্যুকে লেলিয়ে দেবেন ঐ নীচ সাদা মহিলার দিকে। কিন্তু ঐ মহিলার মরতে একটু সময় লাগবে। কারণ মারণদেবকে আগে প্রার্থনাগুলো সব শুনতে হবে।       

“আমরা ঐ মহিলার নখ, মল-মূত্র আর যা কিছু জোগাড় করব সেগুলো এমন জায়গায় পুঁততে হবে যাতে তুমি সবথেকে ভালো ফল পাও। একদম চিন্তা কোরো না তুমি, এক বছরের মধ্যেই ঐ মহিলা এই ধরাধাম থেকে বিদায় নেবে। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তুমিও ওর বাঁকা হাসির হাত থেকে রেহাই পাবে। এমনকি চাইলে তুমি এখন এই মুহূর্ত থেকেই খুশি হতে পার। সে জন্য খুব বেশি না, মাত্র আর দুই ডলার খরচ করতে হবে তোমাকে। সেটা কি চাও তুমি?” রোজি মাসিমা জানতে চাইলেন।

মিসেস কেমহাফ মাথা নেড়ে জানালেন যে তিনি এই প্রস্তাবে রাজি নন। “আপনি যখনই বললেন যে আর এক বছরের মধ্যেই ঐ মহিলার সব সুখের শেষ হবে তখন থেকেই আমার বেশ ভালো লাগতে শুরু করেছে। আর আমার আনন্দের কথা যদি বলেন তাহলে একটা কথাই শুধু বলব আমি। যে মুহূর্তে জানা যায় যে সুখ-আনন্দ এ সবই পয়সার খেলা, কেনাও যায়, বেচাও যায়, তখন থেকেই আনন্দটা আর আনন্দ থাকে না। আমি হয়তো আপনার কেরামতি দেখার জন্য ততদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকব না। কিন্তু একটা অন্যায়ের শাস্তি দিতে পারব জেনে আমার যে আনন্দ হচ্ছে, তাতে এখন আমি শান্তিতে মরতে পারব।”

একথা বলে তিনি রাজকীয় ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ওঁর আচরণে মনে হচ্ছিল উনি যেন আবার ওঁর যৌবন ফিরে পেয়েছেন। তাঁর গায়ের শাল যেন হঠাত করেই জমকালো হয়ে উঠল। আর ওঁর পেকে যাওয়া সাদা চুলগুলোও যেন ঝলমল করে উঠল।

হে মারণদেবতা। হে সর্বশক্তিমান। আমাকে আমার শত্রুরা ষড়যন্ত্র করে একেবারে শেষ করে দিয়েছে। আমার সব শুভ চিন্তাকে নষ্ট করে দিয়েছে। যতই সৎভাবে আমি কিছু করার চেষ্টা করেছি সবই কীভাবে যেন অসৎ আর খারাপ কাজে পরিণত হয়ে গিয়েছে। আমার পরিবারের অসম্মান হয়েছে। ছেলেমেয়েদের সবাই অভিশাপ দিয়েছে, খারাপ ব্যবহার করেছে। আমার প্রিয় মানুষগুলোকে সবাই ঠকিয়েছে। ওদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। হে মারণদেব, আমি তোমার কাছে ভিক্ষা চাইছি। আমি চাই আমার শত্রুদের জন্য যে ক্ষতি কামনা করব তা যেন সত্যি হয় তোমার দয়ায়।

যেন দক্ষিণের হাওয়া ওদের শরীরকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শুকিয়ে দেয়। উত্তরের হাওয়া যেন ওদের রক্ত জমিয়ে দেয়। ওদের পেশী এমন অনুভূতিশূন্য করে দেয় যে ওরা যেন নড়তে না পারে। পশ্চিমের হাওয়া যেন ওদের শ্বাস নেওয়ার বায়ুকে এমন ভাবে উড়িয়ে নিয়ে যায় যে ওদের মাথার চুল না থাকে, ওদের নখ ঝরে পড়ে আর শরীরের হাড়গোড় ঝুরঝুরে হয়ে যায়। পুবের বায়ু যেন ওদের মনকে নষ্ট করে দেয়, চোখের দৃষ্টি খারাপ করে দেয় আর ওদের বীজশস্যকে শুকিয়ে দেয়, যাতে আর কোনোদিন শস্য না হতে পারে।                    

আমি চাই ওরা যেন মা-বাবার বিন্দুমাত্র স্নেহভালোবাসা না পেয়েই পটল তোলে। ওদের মেয়েদের গর্ভ যেন শুধুমাত্র অচেনা কারোর বাচ্চা ধারণ করে যাতে ওরা পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আমি প্রার্থনা করি ওদের যদি কোনও সন্তান হয় তারা যেন দুর্বল প্রকৃতির হয়, ওদের শরীর যেন অশক্ত হয়ে পড়ে। এমন দুরবস্থা যেন হয় যে প্রতি মুহূর্তে ঘুরতে ফিরতে, প্রতিটা শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে ওরা নিজেরাই নিজেদের অভিশাপ দেয়। আমি প্রার্থনা করি রোগবালাই আর মৃত্যু যেন ওদের সঙ্গে এমন ছায়ার মতন লেপটে থাকে, যে ওরা কখনই যেন ভালো না থাকে। ওদের শস্যের যেন এমন ক্ষতি হয় যে ওদের গরু বা অন্যান্য গবাদি পশু না খেতে পেয়ে খিদে তেষ্টায় মরে যায়। আমি কামনা করি ওদের ঘরের ছাদ যেন না থাকে আর ঝড়, বজ্র-বিদ্যুৎ যেন ওদের বাড়ির প্রতিটা কোনায়, প্রতিটা ফাঁক ফোকরে ঢুকে বাড়িকে ধ্বংস করে দেয়। বৃষ্টির জল যেন ওদের ঘর ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমি চাই কোনও উপকারে লাগার বদলে সূর্যের তেজ যেন ওদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। আমি প্রার্থনা করি চাঁদের আলো কোনও শান্তি দেওয়ার বদলে ওদের দেউলিয়া করে দিক। ওরা যেন সেই অপমানে কুঁকড়ে গিয়ে সবার কাছে উপহাসের পাত্র হয়ে ওঠে। আমি তোমাকে অনুরোধ জানাই ওদের বন্ধুরা যেন ওদের সঙ্গে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করে যে তার ফলস্বরূপ ওরা ওদের সমস্ত সোনারুপো হারিয়ে ফেলে। সব হারিয়ে ওরা যখন ক্ষমতাহীন হয়ে পড়বে তখন যেন ওদের শত্রুরা ওদের পদানত করে। ওরা যতই ক্ষমা ভিক্ষা করুক শত্রুরা যেন ওদের কোনওরকম দয়া না দেখায়। প্রার্থনা করি ওদের জিভ দিয়ে যেন মিষ্টি কথা না, শুধু বিষবাক্য বের হয়। ওরা যেন চূড়ান্তভাবে একা হয়ে পড়ে। মহামারী আর মৃত্যু যেন ওদের গ্রাস করে। হে মারণদেব আমি এসব কিছুর জন্য তোমার কাছে একান্ত আর্জি জানাচ্ছি শুধুমাত্র এজন্য যে ওরাই আমাকে এই নিঃস্ব অবস্থায় এনেছে। আমার সুনাম নষ্ট করে, আমার মন ভেঙ্গে আমাকে ধ্বংস করে এমন অবস্থা করেছে যে আমি শুধু ভাবি যদি জন্মেই মরে যেতাম, তাহলে আজ এই অভিশপ্ত জীবন বয়ে চলতে হতো না আমাকে। কিন্তু আজ আর কোনও উপায় নেই, তাই এই অবস্থাকেই মেনে নিতে হচ্ছে আমাকে।

যারা জাদুটোনা শিখত আর শেখাত, তাদের এইসব অভিশাপ মুখস্থ করে ফেলতে হতো। আমি অবশ্য রোজি মাসিমার মতন এখনও পুরোটা মুখস্থ করে উঠতে পারিনি। তাই আমি সোজাসুজি জোরা নীলের বই থেকে দেখে দেখে বলতাম। মিসেস কেমহাফ আর আমি হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে একসঙ্গে এই প্রার্থনা করা শিখেছিলাম। আমরা তারপর মোমবাতিগুলোকে ভিনিগার দিয়ে ধুয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে প্রার্থনা করতে শুরু করতাম। সুর করে করে এমন ভাবে প্রার্থনা বলতাম যেন আজীবন এটাই করে আসছি আমরা। মিসেস কেমহাফের বিশ্বাস আর উদ্দীপনা দেখে আমিও প্রেরণা পেতাম। প্রায়ই তিনি গ্রিসের মহিলাদের মতো, টিপে বন্ধ রাখা চোখের সামনে নিজের হাত মুঠো করে ধরতেন আর কব্জির ভিতরের দিকটা কামড়ে ধরতেন।

কোর্টের হিসেব অনুযায়ী ঐ সাদা মহিলার, যার নাম সারা মারি স্যাডলার, জন্ম হয়েছিল ১৯১০ সালে। বিশ্বজুড়ে যখন আর্থিক মন্দা শুরু হলো তখন সারার বয়স কুড়ির কোঠায়। ১৯৩২ সালে সে বেন জোনাথন হলিকে বিয়ে করে। বেন জোনাথন পরবর্তী সময়ে উত্তরাধিকার সূত্রে বেশ কিছু মুদির দোকানের মালিকানা পায়। এছাড়াও অনেকটা জমি আর একটা বেশ বড়সড় কাঠ চেরাই কলের মালিক হয়েছিল সে। ১৯৬৩ সালের বসন্তে মিসেস হলির বয়স ৫৩ বছর। তিন সন্তান; এক ছেলে আর দুই মেয়ে। ছেলে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করে আর মেয়েরা বিয়েশাদি করে মা হয়েছে।  

বয়স্ক হলি দম্পতি শহর থেকে ছ’মাইল দূরে এক বিশাল বাড়িতে বাস করেন। মিসেস হলির শখ হলো পুরনো জিনিস কেনা, কালো মহিলাদের সঙ্গে গালগপ্পো করা, স্বামীর স্বাস্থ্য, নাতিনাতনিদের নিয়ে আলোচনা করা আর নানারকম খাবারদাবার বানানো। হলিদের মাতাল রাঁধুনির বিড়বিড়ানি থেকে এটুকুই উদ্ধার করতে পেরেছি আমি। সে হলো বাতের ব্যথায় কাতর এক বুড়ি মহিলা। বয়স যখন কম ছিল তখন বাচ্চা দেখাশোনার আয়া হিসেবে কাজ করতেন। যা বুঝলাম অন্তত একজন হলিকে তিনি বড় করেছেন। সেই হলি এখন একটা চার্চে মানুষকে ধর্মের বাণী শোনায়।

“ঐ আয়া বুড়ির পেট থেকে আরও অনেক খবর আদায় করা যেত। এমনকি চাইলে কিছু নখের টুকরোও হয়তো জোগাড় করা যেত বলে আমার মনে হয়। সেসব জিনিস আমরা আমাদের এই মারণযজ্ঞে কাজে লাগাতে পারতাম,” রোজি মাসিমাকে আমি বললাম। ঐ আয়া বুড়ি যে মিসেস হলিকে যে একদমই পছন্দ করে না, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। সে তখন থেকে হোঁতকা শুয়োরের মতন মদ খেয়েই চলেছে। তার মাল টানার বহর দেখে সন্দেহ হচ্ছে মাতাল করে তার পেট থেকে কথা আদৌ বের করা যাবে কিনা! এদিকে তাকে মদ খাইয়ে খাইয়ে আমরা ফতুর হচ্ছি।

“নাহ্‌, এভাবে হবে না দেখছি।” একদিন সন্ধ্যেবেলা আমি ঐ আয়া বুড়িকে সঙ্গে নিয়ে যখন স্যাঁতস্যাঁতে ঘুপচি মদের দোকান থেকে বের হচ্ছি, তখন নিজের গাড়িতে বসে একথা বললেন রোজি মাসিমা। এদিকে ততক্ষণে ঐ বুড়িকে ঐদিন মদ খাওয়ানোর জন্য ছয় ডলার খরচ করে ফেলেছি আমি।

“গুজব বা মোদো মাতালের ভরসায় থাকলে চলবে না আমাদের। তার থেকে বরং যার উপর আমরা মারণাস্ত্র প্রয়োগ করব, সোজাসুজি তার কাছ থেকেই আমাদের যা কিছু প্রয়োজন সেসব জোগাড় করতে হবে, বুঝলে?”

“সে আবার কী! এমন আজব কথা আমি জীবনে শুনিনি! যাকে তুক করব, তাকে আগে পাগল না বানিয়ে বা অন্তত মৃত্যুভয় না দেখিয়ে কী করে বলব যে আমরা তাকে তুক করব? সেটা কি সম্ভব?” আমি বলে উঠলাম।

তাই শুনে রোজি মাসিমা ঘোঁতঘোঁত করে উঠলেন।

“শোন, এসব কাজে প্রথম নিয়ম হলো এটাই যে ভালো করে সবকিছু দেখতে হবে। যার উপর এই মারণাস্ত্র প্রয়োগ করা হবে, তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতে হবে বুঝলে? এটা বরং তুমি তোমার খাতায় লিখে নাও।”

“তার মানে আপনি কী বলতে চাইছেন?”

“দেখ, তোমাকে যা করতে হবে তা সোজাসুজি করবে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে গাধার মতন কাজ করবে!”

হলিদের এলাকার দিকে যেতে যেতে আমার মাথায় এক বুদ্ধি এল। আমি ভাবলাম একটা কাল্পনিক কারোর খোঁজ করার ভান করব। এই পরিকল্পনা করতে করতেই হঠাৎ আমার দিমাগ কি বাত্তি জ্বলে উঠল। বাড়ির সামনের খোলা প্রান্তে রোজি মাসিমার গাড়িটা দাঁড় করালাম আমি। জমিটা ছোট ছোট কাঁটা আর ফুল গাছ দিয়ে ঘেরা। মাসিমা আমাকে বলেছিলেন উজ্জ্বল কমলা রঙের বড় ঢোলা গাউন ধরণের জামা পরতে। সেই জামা পরে আমি যখন হাঁটছিলাম, হাওয়ায় চোটে জামা উড়ে আমার পা দেখা যাচ্ছিল। মিসেস হলি বাড়ির পিছনের দিকের ছাউনি দেওয়া বাগানে ছিলেন। খুব মিষ্টি দেখতে এক কালো তরুণীর সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। অমন ঝলমলে জামা পরা আমাকে এগিয়ে আসতে দেখে দুজনেই বেশ বিস্মিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।

“মিসেস হলি, আমি বরং এখন যাই।” মেয়েটি বলল।

“আরে না না, তুমি দাঁড়াও তো। উনি হয়তো একজন ফ্যাকাসে চামড়ার আফ্রিকান মহিলা। কোথাও একটা যেতে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে এখানে ঢুকে পড়েছেন।” বলতে বলতে তিনি তরুণীটির পাঁজরে একটা হালকা গুঁতো দিলেন। দুজনেই খিলখিল করে হেসে ফেলল।

“কেমন আছেন আপনারা?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

“আমরা ভালোই আছি। আপনি?” মিসেস হলি উত্তর দিলেন আর মেয়েটি বেশ সন্দেহের চোখে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। ওরা এতক্ষণ বেশ একমাথা হয়ে কথা বলছিল। আমি কথা বলা শুরু করতে দুজনেই উঠে দাঁড়াল।

“আমি একজনকে খুঁজছি। তার নাম জোসায়া হেন্সন।”

আমি টম চাচার কেবিন বইয়ের সেই কালো দাসের নাম নিলাম, যে পালিয়ে গিয়েছিল।

“আপনি কি বলতে পারবেন যে ও আপনার এখানে থাকে নাকি?” কথায় কথায় আমি বোধহয় এটাও জিজ্ঞাসা করলাম।

“নামটা তো ভীষণ চেনা চেনা লাগছে!” কালো তরুণীটি বলল।

“আপনিই কি মিসেস হলি?” আমি আলগা ভাবে জানতে চাইলাম। উনি তখন একটু ঘেঁটে গিয়েছেন। জোসায়া হেন্সন নামটা উনি একেবারেই মনে করতে পারছেন না।

“অবশ্যই। আমিই মিসেস হলি”, বলতে বলতে মৃদু হেসে তিনি হাত বুলিয়ে নিজের পোশাক পরিপাটি করতে লাগলেন। তাঁর সোনালি চুলে ধুসর রঙের ছোঁয়া। হালকা ছাই রঙের মুখে রোদপোড়া ভাব নেই। হাতের আঙ্গুলগুলো ভোঁতা কিন্তু বেশ যত্নআত্তি করা। ‘আর এ আমার… ইয়ে… বন্ধু, ক্যারোলিন উইলিয়ামস।”

ক্যারোলিন একটু মাথা নাড়াল মাত্র।

“আমাকে একজন বলছিল জোসায়া হয়তো এদিকেই কোথাও এসেছে…”

“তাই নাকি! কিন্তু আমরা কেউই তাকে দেখিনি। আমরা এখানে এই মিষ্টি রোদ্দুরে বসে বসে মটরশুঁটির খোসা ছাড়াচ্ছিলাম।” মিসেস হলি বললেন।

“আপনি কি ফ্যাকাসে চামড়ার আফ্রিকান?” ক্যারোলিন জিজ্ঞাসা করল।  

“না।” আমি উত্তর দিলাম। তারপর বললাম, “আমি রোজি মাসিমার সঙ্গে কাজ করি। আপাতত কাজ শিখছি। জাদুটোনার কাজ।”

“সেকি! কেন! আমি তো মনে করি আপনার মতন এমন সুন্দরী এক মহিলা জীবনে আরও ভালো কাজ করতে পারে। সেই ছোট্টবেলা থেকেই আমি রোজি মাসিমার নাম শুনেছি। সবাই কিন্তু এটাই বলত যে জাদুটোনার কাজ ভারী নোং… ইয়ে, মানে আমি বলতে চাইছি সেসব খুব বোকাবোকা আর অন্ধকার জগতের কাজ। আমরা অবশ্য সেসবে বিশ্বাস করিনা, তাই না ক্যারোলিন?” মিসেস হলি বললেন।

“নাহ্‌।”

ক্যারোলিন মিসেস হলির বাহুতে হাত রাখল। যেন আমাকে বলতে চাইল, “আপনি বরং এখান থেকে মানে মানে কেটে পড়ুন। এসব হাবিজাবি বলে আমার সাদা বন্ধুর মাথাটা খাবেন না।” রান্নাঘরের জানলা থেকেও “দূর হও”, এরকম মুখভঙ্গি নিয়ে আরেকটা মুখ উঁকি দিল। সেই মুখ আর কারোর নয়, সেই আয়া বুড়ির।       

“আমি ভাবছি আপনি যে বললেন আপনি জাদুটোনায় মোটে বিশ্বাস করেন না, তা সেটার প্রমাণ দিতে পারবেন কি?”

“প্রমাণ?” রাগী গলায় প্রশ্ন করলেন উনি।

“তাইই তো বললাম আমি, তাই না?” আমিও তেরিয়া জবাব দিলাম।

“কালো নিগারদের এসব জাদু ফাদুতে যে আমি ভয় পাই তা নয়, কিন্তু তার জন্য প্রমাণ কেন দিতে যাব শুনি?” কথাটা বলতে বলতে মিসেস হলি ক্যারোলিনের কাঁধে হাত রাখলেন। সেই হাতে ভরসার ছোঁয়া। সেই ছোঁয়া যেন বলতে চাইল যে কালো নিগার বলতে তিনি আমাকেই বুঝিয়েছেন, ক্যারোলিনকে নয়।

“তাহলে সেক্ষেত্রে আপনি আমাদের দেখিয়ে দিন না কেন যে আপনি সত্যিই এসবে ভয় পান না?” এই ‘আমাদের’ শব্দটা বলে আমি কৌশলে ক্যারোলিনকেও আমার সঙ্গে কালো মানুষদের দলে ঢুকিয়ে নিলাম। আমি চাই ‘কালো নিগার’, এই শব্দের ব্যবহারে ওর ভিতরেও ধিকিধিকি রাগ জ্বলে উঠুক। তাহলেই মিসেস হলি একা পড়ে যাবেন। যতই হোক, বিজ্ঞানের মহান আবিষ্কর্তা, আবার একই সঙ্গে বিজ্ঞানের অভিশাপ বর্ষণকারী তো সাদা চামড়ার মানুষরাই। ওরাই তো জোরজবরদস্তি প্রভু যীশুর নামে কালো নিগারদের উপর এইসব চাপিয়ে দিয়েছে।

“বেশ, ঠিক আছে। আপনি চাইলে তাও করতে পারি আমি।” বলতে বলতে উনি খুব অভিজাত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকলেন। এতক্ষণ তিনি একনাগাড়ে দাঁতে দাঁত ঘসছিলেন। উপরের ঠোঁট শক্ত হয়ে গিয়েছে। যেন বলতে চাইছেন, ‘দেখি আপনি কী করতে পারেন!’ পাতলা দুই ঠোঁট দাঁতের উপর চেপে বন্ধ করে রেখেছেন। মুখটা ভাবলেশহীন, আবার একইসঙ্গে সংকল্পে দৃঢ়। এই দেশের অনেক জায়গায় এখনও সাদা রক্ত পবিত্র রয়ে গিয়েছে। তাদের সঙ্গে অন্য জাতের রক্ত মেশেনি। এখন এই মুহূর্তে ওনার মুখটা ঠিক সেরকমই দেখাচ্ছে। যেন ধারাল তরবারি দিয়ে কেটে বানানো।

“আপনি কি মিসেস হানা লু কেমহাফ বলে কাউকে চেনেন?” জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

“না, চিনি না।”

“উনি কিন্তু আপনার মতন সাদা চামড়ার নন। উনি একজন কালো মহিলা।”

“হানা লু… হানা লু… আমরা এই নামের কাউকে চিনি নাকি?” ক্যারোলিনের দিকে ফিরে উনি জিজ্ঞাসা করলেন।

“না ম্যাডাম, চিনি না।” ক্যারোলিন উত্তর দিল।

“যাকগে, উনি আপনাকে চেনেন। উনি বলেছেন যে আর্থিক মন্দার সময় খাবার বিলির কাতারে আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আর এটাও বলেছেন যে যেহেতু উনি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় পরেছিলেন, তাই আপনি তাঁকে খাবার দেননি।”

“খাবার বিলির কাতার, আর্থিক মন্দা, ভালো জামাকাপড়, খাবার না দেওয়া? আমি তো বুঝতেই পারছি না আপনি ঠিক কিসের কথা বলছেন!” কুড়ি বছর আগে কিছু কালো মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছেন এখন তার বিন্দুমাত্র স্মৃতি নেই ওঁর। একটু অনুশোচনা বা সামান্য গ্লানির লেশমাত্রও নেই ওঁর আচরণে।

“বাদ দিন তাহলে। এমনিতেও তাতে সত্যিই তো কিছু যায় আসে না। যেহেতু আপনি এসবে বিশ্বাস করেন না… কিন্তু উনি বলছিলেন যে আপনি তাঁর সঙ্গে অন্যায় করেছেন। এমনিতে একজন ধার্মিক খৃষ্টান হিসেবে উনি এটা জানেন, উপযুক্ত সময়ে প্রভুর সামনে সব অন্যায়েরই বিচার হবে। কিন্তু সেই উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করতে করতে একসময় ওঁর মনে হলো সেই সময়টা যেন বড্ড দেরি করে আসছে। তাই উনি আমাদের কাছে এসেছিলেন সাহায্য চাইতে। এখন মুস্কিল হলো এই যে আমরা আবার অকারণে কারোর ক্ষতি করায় বিশ্বাস করি না। তাই রোজি মাসিমা আর আমি ভাবলাম যে এই কাজটা নেওয়াটা বোধহয় ঠিক হবে না আমাদের।” কথাগুলো খুব বিনীত ভাবে বললাম আমি, যতখানি ধর্মপ্রাণ গলায় আমার পক্ষে বলা সম্ভব আর কী।

“যাক, কথাটা শুনে খুশি হলাম।” নিজের হাতের আঙ্গুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন মিসেস হলি।

“তবে একটা কথা আমরা তাঁকে বলেছি যে তিনি চাইলে নিজের আত্মার শান্তি পুনরুদ্ধার করতে পারেন। তাঁর মতে আপনিই ওঁর থেকে সেই আত্মার শান্তি ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। আর এটা তো জলের মতন পরিষ্কার বোঝাই যাচ্ছে যে তখন আপনি কোনও কিছু নিয়েই বিশেষ মাথা ঘামাচ্ছিলেন না। যতই হোক, সামনের বসন্তেই আপনার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।” আমি বললাম।

“আরে সেটা তো সেই বত্রিশ সালের ঘটনা। হানা লু বললেন, তাই না?” মিসেস হলি বলে উঠলেন।

“ঠিক তাই।”

“সে ঠিক কতোটা কালো ছিল বলতে পারবেন? অনেক সময় কালো মুখগুলো আমি এভাবেই মনে রাখি।”

“তার আর দরকার নেই। যেহেতু আপনি বিশ্বাসই করেন না…”

“সে তো ঠিকই। আমি মোটেই বিশ্বাস করি না!” জোর দিয়ে বলে উঠলেন উনি।

“দেখুন, আপনাদের এসব ঝুট ঝামেলার মধ্যে আমি থাকতে চাইনা। রোজি মাসিমাও না। এমনকি মিসেস কেমহাফ চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তো আমরা দুজনের কেউ বুঝতেও পারিনি যে উনি আপনার কথা বলছিলেন। আপনি গরিব নিগারদের জন্য প্রতি বছর কত খরচ করেন সেসব কি আমরা জানি না? আমরা জানি আপনি দরকার না থাকলেও নিজের চাষের কাজে গরিব কালোদের রাখেন শুধুমাত্র ওদের সাহায্য করার জন্য। প্রভু যীশুর মহানুভবতা আর ভালবাসা বিলিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আপনি একজন উদাহরণস্বরূপ। আর এখন তো আমি নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছি যে আপনার নিগার বন্ধুও আছে।”

“আপনি ঠিক কী চান খুলে বলুন তো?” উনি জানতে চাইলেন।

“মিসেস কেমহাফ যা চান তা খুব বেশি কিছু না। অল্প কয়েকটা নখের টুকরো আর কয়েকটা চুল, যা আপনার চিরুনি থেকে দিলেও হবে। সঙ্গে আপনার শরীরের বর্জ্য মল-মুত্র। বেশি না, খুব সামান্য পরিমাণ হলেই চলবে। প্রথম দু’টোর কোনোটা যদি নেহাত না দিতে চান তাহলে আমি অপেক্ষা করতে রাজি আছি। আপনি আপনার গত একবছরে পরা কোন জামাকাপড়ও দিতে পারেন। মানে এমন কিছু দিন যাতে আপনার শরীরের গন্ধ আছে।”

“কী!” মিসেস হলি সরু গলায় খ্যানখ্যান করে উঠলেন।

“বলে নাকি এসব জিনিসগুলো জুটিয়ে নিয়ে যদি ঠিকমতন মন্ত্র পড়ে প্রার্থনা করা যায় তাহলে একজন মানুষ ভিতর থেকে ক্ষয়ে যায়। ঠিক যেভাবে পুরনো মূল্যবান ধাতুর জিনিস ধীরে ধীরে ক্ষয়ে নষ্ট হয়ে যায়।”

মিসেস হলির মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল মুহূর্তে। তাই দেখে ক্যারোলিন নিজের মায়ের মতন আদর করে যত্নের সঙ্গে তাঁকে বাগানের একটা চেয়ারে বসাল।

“ভিতরে গিয়ে আমার ওষুধগুলো নিয়ে এসো না”, বলতেই ক্যারোলিন যেন হরিণের মতন তড়িৎ গতিতে ছুটে গেল।

“দূর হ’ এখান থেকে! দূর হ’!”     

আমি চট করে ঘুরে সরে দাঁড়ালাম। ঠিক সময়ে না সরলে একখানা মস্ত ঝাড়ু ঠিক আমার মাথায় এসে লাগতো। সেই মাতাল আয়া বুড়িটা এখন আর মোটেই মাতাল নয়, সে তার মনিবকর্ত্রীর রক্ষার্থে ঝাড়ুটা আমার দিকে ছুঁড়ে মেরেছে।

“ধান্দাবাজ ঠগ। আপনি একদম ভয় পাবেন না তো,” মিসেস হলিকে সান্ত্বনা দিল বুড়ি। এদিকে মিসেস হলি ততক্ষণে সত্যি সত্যি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছেন।

মিসেস হলির সঙ্গে দেখা করার কিছুদিনের মধ্যেই মিসেস কেমহাফ মারা গেলেন। কবর দেওয়ার সময় রোজি মাসিমা আর আমি ওর কফিনের পিছন পিছন গেলাম। কালো পোশাকে রোজি মাসিমাকে ভারী অভিজাত দেখাচ্ছিল। তারপর আমরা ঘাসের জঙ্গল পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠলাম। জঙ্গলাকীর্ণ একটা জায়গায় মিসেস কেমহাফ চিরশান্তিতে শুয়ে রইলেন। তাঁর স্বামী সন্তানদের কবরের কাছাকাছি হলেও, বলতে গেলে একাই। খুব অল্প লোকজনই এসেছিল। তাই মিসেস হলির বুড়ি ন্যানি আর তার স্বামীর মুখটা সহজেই চোখে পড়ছিল। ওদের আসতেই হতো। যতই হোক, মিস্টার হলি তাঁর সমস্ত লোকবল লাগিয়ে হানা লু কেমহাফকে খুঁজছিলেন। সে যে সত্যিই মারা গিয়েছে সেটা তাদের নিজের চোখে দেখা তো দরকারই।

কয়েকমাস পর খবরের কাগজে পড়লাম যে সারা মারি স্যাডলার হলিও মারা গিয়েছেন। কাগজে ওঁর কম বয়সের সৌন্দর্য ও প্রাণোচ্ছ্বলতার কথা ফলাও করে লিখেছে। বিয়ের পর থেকে যারা ওঁর থেকে কম ভাগ্যবান ছিল, তাদের জন্য তাঁর প্রাণ কাঁদত। তিনি শুধু তাঁর লোকালয় না, তাঁর চার্চেরও একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলেন। উনি যে দীর্ঘদিন ধরে কঠিন অসুখে ভুগছিলেন, খবরে খুব সংক্ষেপে সেটাও জানা গেল। যারাই ওঁকে চেনেন তারা সবাই নিশ্চিত যে রোগে ভুগে ছোট্ট হয়ে যাওয়া শরীর আর মন নিয়ে উনি পৃথিবীতে থাকার সময় যতটা কষ্ট পেয়েছেন তাঁর আত্মা ঠিক ততটাই শান্তি পেয়েছে স্বর্গে গিয়ে। এমনিতে আমরা মিসেস হলির শারীরিক অবনতি সম্পর্কে সব খবরই পেতাম ক্যারোলিনের কাছ থেকে। আমার দেখা করে আসার পর থেকেই ওদের সম্পর্কে চিড় ধরে। মিসেস হলি ক্যারোলিনের কালো চামড়াকে ভয় পেতে শুরু করেন। আস্তে আস্তে অবস্থা এমন হয় যে ক্যারোলিন ওঁর কাছে গেলেই উনি ভয় পেতেন। আমার দেখা করে আসার এক সপ্তাহ পর থেকেই তিনি দোতলায় নিজের শোওয়ার ঘরে খাওয়াদাওয়া শুরু করেন। ধীরে ধীরে সবকিছুই তিনি করতে শুরু করলেন ঐ ঘরের ভিতরে থেকে। নিজের মাথা থেকে ঝরে পড়া চুল, চিরুনিতে লেগে থাকা চুল, সব তিনি ভীষণ মনোযোগ দিয়ে কুড়িয়ে রাখতেন, সবসময়। এ কাজটা তিনি এতটাই মন দিয়ে করতেন যে মনে হতো, এটা না করতে পারলে তিনি মারাই যাবেন হয়তো বা। এছাড়া তিনি নিজের নখ খেতে শুরু করেন। এমনকি মিসেস হলি তাঁর শরীরের বর্জ্য পদার্থ অবধি সংগ্রহ করতে চাইছিলেন। সেজন্য তিনি যা শুরু করলেন সেটাই ছিল সবথেকে উদ্ভট। বর্জ্যবাহী নালিকে তিনি আর বিশ্বাস করতে পারতেন না। তাই তিনি আর ফ্লাশ করতেন না। আয়া বুড়ির সাহায্যে তিনি নিজের মল-মূত্র দোতলার একটা বন্ধ ঘরে প্লাস্টিক প্যাকেট আর পিপেয় ভরে জমিয়ে রাখতেন। দিনে দিনে তাঁর খাওয়ার পরিমাণ কমতে থাকে। তারপর একসময় খাওয়া বন্ধই হয়ে গেল তাঁর একেবারে। এ সব কথাই আয়া বুড়ি ক্যারোলিনকে জানিয়েছিল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দুর্গন্ধে ঐ বাড়িতে কারো পক্ষে টেঁকা মুস্কিল হয়ে উঠেছিল। মিসেস হলির স্বামী তাঁর স্ত্রীকে খুবই ভালবাসতেন। কিন্তু শেষের দিকে তিনিও আয়া বুড়ির বাড়িতে একটা বাড়তি ঘরে ঠাঁই নিয়েছিলেন।

হাত দিয়ে আড়াল করে মিসেস হলির যে মুখ একদিন বাঁকা হাসি হেসেছিল, সে মুখে আর হাসি আসত না। তাঁর শূন্য চোখের দৃষ্টি সবসময় চকচক করত। পাছে একটাও চুল হারিয়ে যায়, সেই দুশ্চিন্তা তাঁর হাতদুটোকে সবসময় ব্যস্ত করে রাখত। সারা বাড়ির নোংরা পুতিগন্ধ আর প্রতি মুহূর্তের উদ্বেগ তাঁর মুখে কুঁচকে শক্ত হয়ে চেপে বসেছিল। তাঁকে দেখে মনে হতো আর কিছু নয়, একমাত্র মৃত্যুই বোধহয় তাঁর চেহারার সব দাগ, সব ভাঁজকে মসৃণ করে তুলতে পারে। 

https://www.smithsonianmag.com/history/story-josiah-henson-real-inspiration-uncle-toms-cabin-180969094/

নিগার, নিগ্রো শব্দের অপভ্রংশ, শব্দটার আসল মানে – কালো। আমেরিকায় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের এই নামে অভিহিত করা হতো। আফ্রিকান আমেরিকানরা নিজেদের মধ্যে এই শব্দ ব্যবহার করলেও সাদা চামড়ার কেউ এই শব্দটা বললে তা তাচ্ছিল্য ও অপমানজনক বলেই গণ্য হয়। তারই ফলশ্রুতিতে ধীরে ধীরে এই শব্দের ব্যবহার কমে এসেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। ষাটের দশক থেকে একধরনের প্রগতিশীল কৃষ্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে কৃষ্ণাঙ্গরা শব্দটি ‘রিক্লেম’ করতে চাইলেও এর ব্যবহার নিয়ে বহু বিতর্ক রয়ে যায়।

অ্যালিস ওয়াকার একজন আফ্রিকান আমেরিকান সাহিত্যিক। উপন্যাস, ছোটগল্প আর কবিতার সঙ্গে তিনি বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্মেও জড়িত ছিলেন। ১৯৮২ তে তাঁর লেখা উপন্যাস দ্য কালার পার্পল এর জন্য ন্যাশনাল বুক এ্যাওয়ার্ড ও পুলিতজার পুরস্কার পান তিনি। তাঁর সৃষ্টিতে কালো আমেরিকান সমাজের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। অনূদিত গল্পটি The Revenge of Hannah Kemhuff – তাঁর ছোটগল্পের বই In Love and Trouble: Stories of Black Women (1973) বইয়ের একটি গল্প।

সুস্মিতা সরকার: গল্পের বই পড়া, গল্প লেখা আর আড্ডা প্রিয়।

1 thought on “হানা কেমহাফের প্রতিশোধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *