এই সময়ে, কবি ও কবিতার উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নেমে আসার সময়ে, দেশ ও দেশবাসীর উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নেমে আসার সময়ে দাঁড়িয়ে কিছু কবিতা, কিছু প্রতিবাদের স্বর। দ্বিতীয় কিস্তি – জি এন সাইবাবার কবিতা। ভাষান্তর – সিদ্ধার্থ বসু।

আমার জন্য কেঁদো না মা

আমায় দেখতে এসে
আমার জন্য তুমি কেঁদো না মা
ফাইবার কাচের জানলার ওপার থেকে
আমি তোমার মুখ দেখতে পাইনি,
আমার বিকল শরীরটা দেখতে পেলে
তুমি ঠিক বুঝতে যে আমি বেঁচে আছি
আমি এখন বাড়িতে থাকি না বলেও তুমি শোক কোরো না, মা
যখন বাড়িতে থাকতাম,
আমার নিজের জগতে,
আমার অনেক বন্ধু ছিল, জানো
কিন্তু যখন পুনা জেলের এই আন্ডা সেলে আটক হলাম
সারা পৃথিবী জুড়ে দেখলাম আরো কত যে আমার স্বজন
আমার ভাঙাচোরা স্বাস্থ্য দেখে কষ্ট পেয়ো না মাগো
সেই ছেলেবেলায়
যখন একগ্লাস দুধও জুটত না আমাদের
তোমার কথার জোর আর স্পর্ধা আমায় পুষ্টি যোগাত
আজকের এই যন্ত্রণা আর ব্যাধিদীর্ণ দুঃসময়েও
তোমার সেইসব প্রাণময় কথার স্মৃতিরা আমায় শক্তি দেয়
আশা হারিও না মা,
এই কারাগার মানে মৃত্যু নয়
এ আমার পুনর্জন্ম
এবং আমি বাড়ি ফিরব
তোমার কোলে
যেখানে ভরসা আর সাহস দিয়ে তুমি আমায় গড়ে তুলেছ
আমার পরাধীনতার কথা ভেবে ভেঙে পোড়ো না, মা আমার
গোটা পৃথিবীকে জানিয়ে দাও যে
আমার একার স্বাধীনতা হারানো আসলে
অনেকের জন্য স্বাধীনতা জিতে নেওয়া
কারণ, যে মানুষই আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে
সে-ই এ পৃথিবীর দুর্ভাগা সর্বস্বান্তদের জন্য বাঁচতে চেয়েছে
আর, সেইখানেই আমার মুক্তি
১৪ নভেম্বর ২০১৭-য় তুমি যখন ‘মুলাকাত’-এ এসেছিলে, জেলের জানলায়

মহাসাগরই তাঁর স্বর

ছটফটে কবিটি বারবার উঠে নেমে
ফাঁসিকাঠের দৈর্ঘ্যের আঁচ নিচ্ছিলেন,
যেমন ফৈজ করেছিলেন প্রায় পাঁচ দশক আগে।

ভীমা-কোরেগাঁও ইতিহাসে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
মৌনের পৃথিবীকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

পুনা ছিল চিতপাবনদের রাজধানী।
তাদের সর্বশেষ ঘাঁটিটা ফের একবার বিষদাঁত বার করল।
পেশওয়াইদের ভূত আবার চাবুক আছড়াল।
নানার আদেশে,
ঘসীরাম কোতোয়াল লালতাতানো লৌহগোলকে বেঁধে মানবতায় বেড়ি পরাল।
পার্থিব হৃদয়গুলোর গলায় পিকদানি ঝুলিয়ে দেওয়া হল।

একদিন মহাত্মাজী এখানে একটি আমগাছ লাগিয়েছিলেন,
এবং শান্তিপূর্ণ লড়াইয়ে আম্বেদকরকে নীরবে বশ করেছিলেন।

সেই গাছের চবুতরায় একটা বাতি জ্বলে প্রতিদিন
আর দর্শনার্থীরা আসতে যেতে পেন্নাম ঠোকে।
অশীতিপর কবি সে গাছের ডালপালাগুলোর ছায়ার দিকে চেয়ে থাকেন,
মৃত্যুর আঙিনার ওপর সে ছায়ারা দুলছে।

উঁচু পাথুরে দেওয়ালের বাইরে,
সন্ত্রাসের এক নির্মম বিদ্যুল্লেখা যেন ঝলকে ওঠে।
য়েরওয়াডা জেগে ওঠে আবার।

গোটা দেশের পাথুরে পাঁচিল ধ’রে
পুনার স্বৈরাচারের কালো ছায়া পড়ে।

ইতিহাসের রাস্তায়
স্মৃতি উপচে পড়ে।

সোক্রাতেসকে হেমলক খেতে দেওয়া হয়েছিল।
আকাশের অন্ধিসন্ধি খুঁজে পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের ধারণা বাতিল করার জন্য গালিলেওকে চড়তে হয়েছিল ফাঁসিকাঠে,
তুর্কী সৈন্যরা তাদের সেনা ব্যারাকে তাঁর কবিতা বালিশের নিচে লুকিয়ে পড়ত বলে, নাজিম বন্দী হয়েছিলেন,
খেটে হয়রান হাতগুলোর গান গেয়েছিলেন বলে ফৈজের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল।

হাতকড়া পরা কবিকে আইনি আদালতের বন্দীশালার দরজায় হাঁটতে দেখে,
স্বনামধন্য এক লেখক কাঁদছিলেন,
বুকভাঙা অশ্রু নামছিল তাঁর গাল বেয়ে।
যুগের পর যুগ গেছে,
আর এখন
সময়ের প্রহসনে
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

তাঁর কবিতায় মাটির গন্ধ মাখা আছে,
সাগর মথিত হয় তার একেক পংক্তিতে,
পূবালী ঘূর্ণিঝড়ের গর্জন শোনা যায়,
পশ্চিমা মৌসুমী বাতাস বাজবিদ্যুৎ নিয়ে ধেয়ে আসে, অশেষ মুষলধারায়,
জনতার সমবেত স্বর শোনা যায় তার ক্ষিপ্র শব্দস্রোতে।
তার ঘুমপাড়ানি সুরে শিশুরা ভবিষ্যতের প্রাণময় স্বপ্নে ঢলে পড়ে,
তার ছন্দ প্রতিধ্বনিত হয়
মহৎ পর্বতমালার মৌনে,
জীবন্ত বনভূমির প্রত্যঙ্গে,
মাটির অনতিক্রম্য বোল্ডারগুলোর গায়ে,
আর মাটির প্রতিরোধ চলকে ওঠে
দাক্ষিণাত্য মালভূমির কর্কশ পাথুরে ফাটলের মুখ দিয়ে

আর তারপর এক মহাকায় নদী হয়ে ওঠে তারা।

শুধু কবিতাই, আহাম্মক।
শুধু বিস্ময় জাগ্যনো কবিতাই সেই অস্ত্র, যা পারে
ইতিহাসের ইস্পাত-রেকাবকে ভেঙে গলিয়ে দিতে।

তাঁর কবিতা বীজেদের পাখা দিয়েছে,
আর তারা
ভালোবাসার নরম বাতাসে ভর করে
প্রতিটা সমুদ্রতীরের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে,
তারপর মাটির সিক্ত ত্বককে তারা আলিঙ্গন করছে।
এই মহাসমুদ্র তাঁর স্বরে কথা বলছে।

১৪ মে ২০১৯ – ভারাভারা রাওয়ের জন্য

আমার স্বর্গ নরকের এক সত্যি গল্প

এই মাহারসন্তান করেনি কিছুই
শুধু, আত্মমর্যাদার নেশায়
ভবিষ্যৎ স্মার্ট-সিটির একখানা সাইনবোর্ড ভেঙে, রাষ্ট্রের বিরাগভাজন হয়েছে।

ওকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে বন্দী করা হয়েছে।

এই চামারসন্তান করেনি কিছুই
শুধু, আত্মবিবৃতির নেশায়
ভবিষ্যৎ স্মার্ট-সিটির পেট থেকে
একটা মরা গরু সরিয়ে নিয়ে যেতে অস্বীকার ক’রে, রাষ্ট্রের বিরাগভাজন হয়েছে।

ওকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে আটক করা হয়েছে।

উঁচু সোনালী টেবিলের ওপার থেকে
পরচুলওলা ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর রায় জানালেন,
মাহার ও চামার ঐহিক ও পারলৌকিক ভাবে স্মার্ট-সিটি থেকে নির্বাসিত হল।

এরপর মাহারের স্বর্গবাস হল
আর চামারের নরক
দুজনের ওপরই ঈশ্বরের বিষ্ঠা সাফাইয়ের পবিত্র
ভার ন্যস্ত হল।
ইহ এবং পারলৌকিক প্রতিটি সকাল-সন্ধে এবং দিনের বাকি সময়টুকুও
তাদের কেটে যেত নর্দমা পরিষ্কারের কাজে।

১২ এপ্রিল ২০১৮

নিজেকে উদারবাদী বলো

নিজেকে উদারবাদী ঘোষণা করতে চাইলে করেই ফ্যালো না হয়।
চড়িয়ে নাও মাথায় একটা গান্ধী টুপি,
কিম্বা একখানা নেহরু উষ্ণীষ।

কিছুই যায় আসে না তাতে
যতক্ষণ না সাম্যের ভাবকে অন্তরে ধারণ করতে পারছ।

মন্দিরে যাতায়াত করেই যদি ভোট আনতে হয়,
তো তাতে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীরাই তো জিতবে হে,
এবং কোনো ছুটোছুটি ছাড়াই প্রতিটি পুরোহিত
ক্ষমতার আসনে বসে পড়তে পারবে।

গণতন্ত্র যদি জাদুর খেল হত হে,
তো, কালাজাদুকরেরাই হত দেশের শাসক।

ভোট ভোট করে মানুষের টাকা নয়ছয় করো কেন?
শিবকে অর্ঘ্যদানেই যখন নির্বাচন জেতা সম্ভব,
তো খামোখা প্রচার অভিযান করেই বা মরো কেন?

আর শোনো,
তোমার ধর্মনিরপেক্ষতা যদি এতই উচ্চমার্গের,
তাহলে সংবিধানের আদৌ দরকারটা কী বলতে পারো?

কবীর কী বলেন জানো?
“শোনো ভাই সাধু,
মানুষের প্রতি অবিচার ক’রে
কে কবে সমাজকে বদলেছে?”

২৮ এপ্রিল ২০১৮

মরতে চাইনি

মরতে চাইলাম না যখন
তখন আমার শেকলগুলো আলগা করে দেওয়া হল
আমি বেরিয়ে এলাম ছড়ানো ঘাসজঙ্গলে
কিন্তু, ঘাসের পাতাগুলোর দিকে স্মিত চাইতেই
আমার সে হাসি প্রভুদের অসহ্য বোধ হল
ফলে, ফের বেড়ি পড়ল আমার পায়ে
আবার যখন যাপনের ক্লান্তি নিয়ে
মরে যেতে অস্বীকার করলাম আমি
মালিকরা আমায় পুনর্বার রেহাই দিলেন
আর আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম
উদীয়মান সূর্যের নিচে মাতাল করা ঘাসের সবুজে
হাওয়ায় মাথা দোলানো ঘাসপাতাগুলোর দিকে সহাস্য মুখ তুলতেই
তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল আমার এই নাছোড় স্বভাবে
এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই, আবার আমি বন্দী হলাম
আজও আমি— খুব গোঁয়ারের মতোই— মরতে অসম্মত
আর, দুঃখের কথাটা হল এই যে, ওরা জানেই না
কীভাবে আমায় মরতে রাজি করানো যায়
কেননা,
বেড়ে উঠতে থাকা ঘাসেদের সংসারের ওই শিরশিরিনি যে আমার বড় প্রিয়

নভেম্বর ২০১৭, অক্টোবর ১৯১৭-কে মনে করে

তোমার চিরসবুজ হাসির কথা ভাবি

তোমার আশামাখা চোখদুটোর থেকে অনেক দূরে,
একার জেলঘরে বসে
তোমার চিরসবুজ হাসির কথা ভাবি,
আমার হৃদয় আর্তরব তোলে, সারা গা কাঁপে
আমি, ঠিক একটা ডালপালা ছাঁটা, শিকড় ওপড়ানো গাছ।
আমার হৃৎস্পন্দনের ভীষণ শব্দে মনে হয়
হাজার হিমালয় যেন মহাশূন্য থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে খসে পড়ছে।
সেই চাষীদের ব্যথায়, যাদের পেকে ওঠা সোনার ফসলের ক্ষেত থেকে উপড়ে আনা হয়েছে, স্রেফ দানব ট্রেনের তলায় পিষে মারার জন্য।
সেই আদিবাসীদের যন্ত্রণায়, যাদের গাঁ জ্বালিয়ে তাদের স্বজনদের গুলি করে মারা হয়েছে, খনি-তৈরির-জন্য জঙ্গল খালি করে দেবার অভিসন্ধিতে।
যাতে কিনা দেশের প্রবৃদ্ধির হার লাফিয়ে বাড়তে পারে।
দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত জেলের মধ্যে বসে,
এই মেঘমেদুর বাদলা দিনে আমি ভাবছি মানুষ আর তাদের রোজকার বাঁচা-মরার যুদ্ধের কথা,
যন্ত্রণা আমার বাঁ হাতটাকে ফুঁড়ে ফেলছে,
মুচড়ে উঠছে আমার শুকিয়ে আসা পা দুটো,
আর বীভৎস ব্যথা হচ্ছে পেটে।
লক্ষ কোটির শূন্য পাকস্থলীর দাউদাউ আগুনের কথা আমার মাথায় ঘুরছে,
যেন তাদের তীব্র জ্বালা আমার প্রতিটি প্রত্যঙ্গে বাসা বেঁধেছে।
আমার হৃৎপিণ্ড কাতরায়, থরথর করে ওঠে গোটা শরীর
এ রোগের কোনো নিরাময় নেই।
যন্ত্রণায় মরে যাব মনে হয়,
কিন্তু মরতে আমি অস্বীকার করি।
আমি ভাবি, আমাদের ভালোবাসার বাগিচায় কী তুমি করছ এখন।
আমার একান্ত জেলঘরের কঠিন স্তব্ধতায় আমার ব্যথা ঝংকার তোলে,
আর আমার আমি যেন পেরিয়ে পেরিয়ে যায় এই কারাগার, এই পুলিশবাহিনী, কোর্টকাছারি,
সংবাদমাধ্যমের ডাহা মিথ্যাভাষণ, আর হাসপাতালের দুর্গন্ধময় করিডরগুলো।

বন্দীদশার ঘুণে-খাওয়া হাজার দিন রাতের হাহাকার আমায় সংহত করে।
স্বৈর বন্দীশালার অন্ত্রের অন্ধকারে,
আমার যন্ত্রণার দপদপ শিখার নিচে আমার মুখে আলো পড়ে।
ওরা আমাদের শেকল পরিয়েছে, আমাকে উঁচু পাঁচিলের এপাশে এই অপরিসর জেলঘরে, আর তোমাকে পাঁচিলের বাইরে, এক বিস্তীর্ণ বন্দীশালায়।
কিন্তু আশাভরা আগামীর সেই স্বপ্নগুলো কি কেউ কেড়ে নিতে পেরেছে?
ওরা আমাদের স্বপ্নগুলোকে ভয় পায়,
খালি হাত আর খালি পা-লোকগুলোর জন্য আমাদের ভালোবাসায় ওরা সন্ত্রস্ত,
সেই লোকগুলো যারা তাদের আশাকীর্ণ পৃথিবীকে ভালোবাসে।

জেলখানার বন্ধ দরজা থেকে আমি মনের চোখে
দেখি,
আজ সকালে তোমার প্রণয়ের বার্তায় অগাস্টের মেঘের গর্ভ ভরে উঠেছে।

ভালোবাসার অঙ্কুরিত বীজগুলোর উপর, উর্বর মেঘ থেকে বৃষ্টি ঝরছে।
ক্ষমতা সমস্ত জীবনতরুর মূলোচ্ছেদ করতে পারে,
কিন্তু
পারে না রুখতে আমাদের ভালোবাসার অরণ্যের অমোঘ বিস্তার।

সদ্যরোয়া ধানের মাঠের ওপর ভোরের মধুময় বৃষ্টিদিনের স্মৃতিতে আমার হৃদয় পাকসাট দেয়
আর
জেলঘরের লোহার গরাদগুলোর গায়ে আমার দশটা আঙুল আরো শক্ত হয়ে বসে।

১৭ অগাস্ট ২০১৮

এদিনও যাবে পেরিয়ে

মাথা ঘোরা, গা বমি, শ্বাসকষ্ট।
সকালের ঝকমকে দৈনিকপত্রে
আমার দেশের রঙচঙে মানচিত্র আমি ঝাপসা দেখি।

বড় কারবারিরা
নব্বই শতাংশ পর্যন্ত ছাড় চমকিয়ে
মহামুনাফা উদযাপন করছে।

দাপ্তরিক হিসেবনিকেশ অনুসারে,
ডুবতে থাকা জিডিপি এই পর্বে সর্বকালের সর্বোচ্চ চুড়ো ছুঁতে চলেছে।
এই পবিত্র লগ্নে
পুরো বাজার গর্জন করে চলেছে এক
হিংস্র অট্টকন্ঠে।

আমার দেশের উঁচু পাঁচিলের বাইরে
অর্ধনগ্নতার উর্দি-পরা ছেলেমেয়েরা
ভিক্ষে করতে করতে ব্যস্ততম ট্র‍্যাফিকের দ্বীপগুলোকে ঘিরে কুচকাওয়াজ করছে,
দুর্ভাগা নরম মুঠোয় তাদের
মেড ইন চায়না লেখা দেশপ্রেমের নিশান।

মাথা ঘোরা, গা বমি, শ্বাসকষ্ট..
জেল ডাক্তারের প্রশ্ন ছিল,
‘রোজ সকালে ক্যাপসুলগুলো খাচ্ছেন তো?’
দমকা ব্যথার ঝাপট আমার কাঁপা চোখে ধুলোর ঝড় তুলছিল,
আমার শরীর নাড়াঘাঁটা শেষ করে ডাক্তার বললেন:
“চিন্তার কিছু নেই,
আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে।”

উকিলমহোদয় মহামান্য আদালতকে জানালেন:
“ওনার জরুরী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর গতিপ্রকৃতি বেশ স্থিতিশীল”,
এপক্ষের আইনজীবী গলা চড়িয়ে শুধোলেন,
“কোন কোন জরুরি প্রত্যঙ্গ স্থিতিশীল বলুন তো,
এবং ঠিক কতদিন যাবৎ কায়েম এই স্থিতি?”

মাথা ঘোরা, গা বমি, শ্বাসকষ্ট..
সরকারি অর্থনীতিবিদরা আওড়ালেন,
“বাজার জান্তব গতিতে ধাবমান”,
এমনকি অর্ধেক জনসংখ্যা যন্ত্রণায় কাতরানো সত্বেও।

আমাজন, ফ্লিপকার্ট—
দুঃখিত, ওয়ালমার্ট
হিন্দুস্তান লিভার—
অর্থাৎ, ইউনিলিভার ইউকে—
টমাস কুক
ফেসবুক
আলিবাবা, অপো,
গুগল, অ্যাপল,
ওয়ান প্লাস, পেটিএম,
সনি, স্যামসাং,
মাইক্রোসফট, বিগবাস্কেট,
বিগবাজার, জিও, জাগুয়ার,
হন্ডা, টাটা, বাটা,
রিলায়েন্স ডিফেন্স
সক্কলে এই জাঁকালো উপলক্ষে
জাতির উদ্দেশে
বিশেষ অফার ঘোষণা করেছে।

রঙবেরঙ বিজ্ঞাপনে দেশ ভরে উঠছে।

জননেতা তাঁর ফুলেল কন্ঠে জানাচ্ছেন
এই দেশ কারো গড়া নয়,
স্মরণাতীত কোনো কালে এ নিজেই উত্থিত হয়েছিল—
পৃথিবীর প্রাচীনতম ভূখণ্ড
বৃহত্তম গণতন্ত্র—
রেডিও ফেটে পড়ছে

আমার দেবায়তনে
স্বর্গীয় পাকশাল থেকে
পবিত্র পকোড়া এল
—বাদামী রঙের, তেলতেলে—
কিন্তু চেহারায় সেইসব উদ্যোগপতিদের ছাপ,
জাতির সেইসব বেকার আত্মনির্ভরশীলদের,
দেশের সমস্ত বাসস্টপ আর রেলস্টেশনের বাইরে,
আর সব ফুটপাতের ওপর যারা পকোড়া ভাজে,
সেইসব আদত মেড ইন ইন্ডিয়া।

মাথা ঘোরা, গা বমি, শ্বাসকষ্ট..
তেলা খাবার খেতে ডাক্তার আমায় বারণ করেছে, মনে পড়ল,
মনে পড়ল আমার অগ্ন্যাশয়ের ব্যামো
আর তাছাড়াও আরো আঠেরো রকমের রোগবালাই।
কিন্তু তা বলে স্বাধীনতা দিবসের পকোড়া তো আর ফেলে দেওয়া যায় না,
সে যে দেশদ্রোহিতা।

জাতকুলের মতোই কারো জাতীয়তাও অস্বীকার করা যায় না।

প্রধান ফটকের বাইরে
এক বিশাল পতাকার সম্মানে
রক্ষীরা স্যালুট ঠোকে,
আর তার আগে পরে
প্রকাণ্ড সব লাউড স্পিকারে বাজতে থাকে বলিউডি স্বদেশিকতা-চোঁয়ানো গান।

মাথা ঘোরা, গা বমি, শ্বাসকষ্ট..
দেশের স্বাধীন জনতার আজ ছুটির দিন।
কিন্তু বন্দীশালায় আজ সকাল সকাল তালা পড়ে যায়,
যেকোনো সর্বজনীন ছুটি ও মাতাল মোচ্ছবের দিনের মতোই।
দুপুর ১.৩০ টায় বিশেষ মধ্যাহ্নভোজ পরিবেশিত হয়,
তৈলাক্ত, ভাজা ভাজা, আলু-পোলাও
আর তারপরেই আঠেরো ঘন্টার লম্বা লকআপ।

আমি আবার সেই ঝকমকে খবরকাগজে গিয়ে মুখ লুকোই।

জি এন সাইবাবা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরিজির শিক্ষক, কবি এবং আদিবাসী অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ। তাঁকে ২০১৪ সালে মাওবাদী যোগাযোগের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় এবং মানবাধিকার বিরোধী ইউএপিএ আইনে , তথাকথিত দেশদ্রোহিতার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তথাকথিত নিম্নবর্ণের, আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের সন্তান সাইবাবা নিজে ৯০% শারীরিক প্রতিবন্ধী; হুইলচেয়ার ছাড়া তিনি চলতে পারেন না। জেলে থাকার ফলে ইচ্ছাকৃত অব্যবস্থার কারণে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে; বারবার তাঁর পরিবার ও নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক দলের আবেদন সত্ত্বেও রাষ্ট্র ও তার ধামাধরা আইনি ব্যবস্থা তাঁকে জামিন দিতে অস্বীকার করে চলেছে। বস্তুত তাঁকে জেলের ভিতর তিলে তিলে হত্যা করা হচ্ছে। তবু তাঁর কবিতা পড়লে দেখা যায়, দেশদ্রোহী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর সত্ত্বা হার মানতে রাজি নয়। 

সিদ্ধার্থ বসু শিক্ষক ও কবি। নানান বাংলা পত্রপত্রিকায় তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ ও অনুবাদ ছাপা হয়েছে।

আরো পড়ুন: প্রতিবাদের স্বর । অখিল কাত্যালের কবিতা অনুবাদ – শুক্লা সিংহ

4 thoughts on “প্রতিবাদের স্বর । জি এন সাইবাবার কবিতা । ভাষান্তর – সিদ্ধার্থ বসু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *